Saturday, 19 September 2020

মক্কার দুর্ঘটনা ও শক্তিশালী অস্ত্র আর্ক্ অফ গেব্রিয়েল ---

2015 সালের সেপ্টেম্বর মাস, এমন একটি ভয়ানক ঘটনা ঘটেছিল যা পুরো সৌদি আরবিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনাটি প্রায় 2,000 এর উপর মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। মক্কায় বাৎসরিক ধর্মীয় তীর্থযাত্রা কালীন পদপিষ্ট হয়ে তাদের মৃত্যু ঘটে; এর ঠিক তিন মাস বাদে 24 শে ডিসেম্বর থেকে ইন্টারনেটে রাশিয়ান নেভিকে নিয়ে এক অদ্ভুত রকমের গুজব ছড়াতে থাকে।বলা হয় রিসার্চ শীপ বা গবেষণাকারী জাহাজ 'অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির স্কি' সৌদির জেদা শহরের বন্দর থেকে ঠিক এই পদপিষ্টের ঘটনায় দিন আন্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল এবং অ্যান্টার্কটিকায় একটি টপ সিক্রেট বস্তু ইনস্টলেশন করার জন্য নিয়ে গেছে। 

এই আর্টিফ্যাক্টটিকে 'আর্ক অফ গ্যাব্রিয়েল' বলে উল্লেখ করা হয়। একটি লিকড রাশিয়ান রিপোর্ট অনুযায়ী এই বস্তুটি দুটি দুর্যোগের কারণ ছিল। পদপিষ্টের দুর্ঘটনার আগে যখন কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার এটিকে ছুঁয়েছিল তখন এর ভিতর থেকে এক ধরনের শক্তি নির্গত হয় যা সঙ্গে সঙ্গে কাছে থাকা 15 জন কর্মচারীর প্রাণ নিয়ে নেয় এবং এটি পদপিষ্টের ঘটনার আগে কনস্ট্রাকশন ক্রেনটি পরে যাওয়ার জন্য দায়ী।



'সর্চা ফাল' নামক এক ব্লগার প্রথমেই গল্পটা লিখেছিলেন। তাঁর মতে, যখন প্রথমবার এটিকে তোলার চেষ্টা করা হয়, তখন শক্তিশালী বিস্ফোরণ  ঘটেছিল  যার ফলে একটি বড় ক্রেন পড়ে যায় এবং মোট 111 জনের মৃত্যু এবং ঠিক তার পরের মাসেই দ্বিতীয় বার যখন পুনরায় এই চেষ্টা করা হয়েছিল তখন পদপিষ্টের জন্য 2,000 জন এর মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে। এরপরে মক্কার দুই পবিত্র মসজিদের কাস্টোডিয়ানরা মস্কোর রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল এর সাথে এই আর্টিফ্যাক্ট নিয়ে আলোচনা করার জন্য যোগাযোগ করেন।

এতক্ষণ ধরে যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করা হয়েছিল সেগুলো প্রকৃত জীবনে ঘটার সম্ভাবনা 1 থেকে 10 মধ্যে কতটা হতে পারে? সাধারণ ক্ষেত্রে আমরা -1 এ আছি।
যদিও ঘটনাটি ঘটলে অবশ্যই কোন না কোন প্রমাণ থাকবে। ক্রেমলিন মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্স এর দ্বারা তৈরি একটি রিপোর্ট লিক হয়েছিল এবং এখানে লেখা হয়েছিল যে, ঠিক এই সময় দুটি স্যাটেলাইট নেভাল রিসার্চ ভেসেল 'অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির স্কি'কে নিরাপত্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে লঞ্চ করা হয়েছিল এবং এই জাহাজে থাকা বস্তুটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে প্রেসিডেন্ট পুতিন স্বয়ং রিপোর্ট এর ফাইলটিকে 'ক্রিটিকাল মিলিটারি রিলিজিয়াস সিগনিফিকেন্স' বলে লেবেল করেছিলেন।



এটি আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায় যে, আর্ক অফ গ্যাব্রিয়েল আসলে কি?
ইসলামে আমরা মনে করি যে, আর্কএঞ্জেল গ্যাব্রিয়েল হল ধর্মের অন্যতম মুখ্য চরিত্র এবং তিনি ইসলামের প্রাথমিক কালে ক্রমাগত মোহাম্মদ এর সাথে যোগাযোগ রেখে গিয়েছিলেন। যদিও আপনি যদি কোন মুসলিমকে প্রশ্ন করেন তারা 'আর্ক অফ গ্যাব্রিয়েল' সম্পর্কে কী জানে তারা খুব সম্ভবত বলবে তারা কখনও এসম্পর্কে শোনেনি।

এছাড়া পণ্ডিতদের মতে এই আর্টিফ্যাক্টটি বাইবেল সম্বন্ধীয় আর্ক অফ গ্যাব্রিয়েলের মত একই প্রকার এবং এটিও কোন অস্বাভাবিক জ্ঞানের থেকে উদ্ভূত যা মেনস্ট্রিম ইসলামের থেকে অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তারিত এবং অবশ্যই মিডিল ইস্ট এর বাইরে।

ফাল তার ব্লগে দাবি করেছিল যে, এক্ষেত্রে রাশিয়ান পাদ্রীর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল কারণ এই রাশিয়ান চার্চের কাছে ক্রুসেডকালীন অক্ষত থাকা একটি প্রাচীন ইসলামিক ম্যানুস্ক্রিপ্ট আছে। এই মানুস্ক্রিপ্টে  আর্ক্টি কিভাবে পরিচালনা করতে হয় তা সম্বন্ধীয় নির্দেশাবলী ছিল। এছাড়া দাবি করা হয়  আর্ক্এঞ্জেল মোহাম্মদকে এই বস্তুটি হস্তান্তর করেছিল এবং তাকে এই জিনিসটি একটি স্থানে পুঁতে রাখতে বলেছিল। এই স্থানটিতে ফেরেশতারা মানুষ্য সৃষ্টির আগে উপাসনা করার স্থান হিসেবে ব্যবহার করত এবং এই স্থানটি আরবিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত। ডকুমেন্টে ব্যাখ্যা করা হয় যে এটিকে জাজমেন্ট ডে পর্যন্ত লুক্কায়িত রাখার পরিকল্পনা ছিল।




ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি গোপন তত্ত্বে বলা হয়েছে, যে এই অদ্ভুত বস্তুটি আসলে একটি অস্ত্র যাতে দুটো এনার্জি ডিসচার্জ আছে এবং যার ফলাফলস্বরূপ 2015 সালে এত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং এটি একটি প্রমাণ যে, এই আর্কের কার্যপ্রণালী বুঝতে পারলে একে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার করা যেতে পারে। যদিও এই রিপোর্টটির বাস্তবতা নিয়ে অনেক সংশয় রয়েছে। 

যখন আমরা এই আর্ক টিকে ঘিরে বিভিন্ন তথ্য এবং এর স্থানান্তর সম্পর্কিত কাহিনীর উৎস নিয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করি এবং আমরা দেখতে পাই এই একই ঘটনাটি অগণিতবার ইউটিউব এর বিভিন্ন ভিডিও এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ইউ. কে এর  একটি বিখ্যাত নিউজ পেপার 'ডেইলি স্টার' এ আমরা এর উল্লেখ দেখতে পাই এবং এর উৎস সবক্ষেত্রেই 'হোয়াট ডাস ইট মিন ডটকম' এ নিয়ে আসে। এই ওয়েবসাইটটির ব্লগার ছিলেন 'সরচা ফাল' ; 2015 সালের আগে এই আর্কটির বিষয়ে ইন্টারনেটের কোথাও, যেমন - গুগোল বা অনলাইনে একাডেমিক রিসার্চ পেপার এমনকি কোন ডিজিটাল বুকেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়নি। যেন এটি কখনো ছিল না এবং আরো একটি প্রশ্ন থেকে যায় যেটি হল কিভাবে এই বস্তুটি মক্কা থেকে জেডা এবং জেডা থেকে আন্টার্কটিকা সবার অলক্ষ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? এমনকি আর কোন জীবনহানি ছাড়া এবং কেনই বা সৌদি আরবিয়া এত শক্তিশালী একটি বস্তু অন্য একটি দেশের হাতে ছেড়ে দেবে? এটিকে বুঝতে বছরের-পর-বছর সময় লাগলেও তারা নিজেদের কাছে কেন রেখে দেয় নি? ফাল এই তথ্যটি প্রথম সবার সামনে তুলে ধরেন এবং এই কাহিনীর উৎস তার থেকেই শুরু হয়। 




 এই আর্ক অফ গ্যাব্রিয়েল সম্পর্কিত ধাঁধার সমাধান তখনই হবে যখন এই সোর্চা ফাল কে তা জানা যাবে। আমরা হোয়াট ডাজ ইট মীন ডটকমের থেকে জানতে পারি এই ফাল আসলে একজন রাশিয়ান সাইন্টিস্ট এবং একাডেমিক। এর থেকে বোঝা যায় কিভাবে তিনি রাশিয়ান গোপন রিপোর্ট সম্পর্কিত তথ্য জানতে পেরেছিলেন। যদিও 2009 সাল থেকে অনলাইন অল্টারনেটিভ থিওরি কমিউনিটি প্রশ্ন করতে শুরু করলো যে এই চরিত্রটি আসলে কতটি আসল?

 এরপরে অনেক ব্যাকগ্রাউন্ড রিসার্চ করার পর দেখা গেল যে এই নামে কোন রাশিয়ান একাডেমিক এর রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বহু সমালোচনার পর অবশেষে সাইটটি  দাবি করলো যে সর্চা ফাল এই নামটি আসলে একটি নাম নয় এটি একটি খেতাব এবং খেতাবটি এসেছে 'অর্ডার অফ সার্চ ফাল' থেকে যা আসলে একটি গোপন ও অন্ধকার জগত থেকে এসেছে। 

অনেকেই বলেন যে এই সংঘ আসলে পূর্ব ইউরোপের ডাইনিদের একটি সংঘ যা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে এবং প্রথম যার সূচনা হয় 1290 সাল থেকে এবং তাই যদি হয় তার মানে তারা তাদের এই সংঘের কার্যকলাপ পৃথিবীর বহু যুগ ধরে এবং উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে চালিয়ে গেছে। এই সংঘটির উপরিভাগ থেকে 14 জন মহিলা নেতৃত্ব  দিত। যদিও এটা  কেবল মাত্র একটি থিওরি। 
 
এনথ্রপলজি এবং পলিটিকাল সাইন্টিস্ট জেসন কলাভিলের মতে, সৌদি আরবের আর্ক অফ গ্যাব্রিয়েল এর ঘটনাটি একটি ভাওতা। এটি আসলে নেশনালিস্টিক জেনোফোবিয়া তৈরি করার প্রচেষ্টা যা সাধারণ ক্রিশ্চান আমেরিকানদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে বিশেষ করে তাদের মধ্যে যারা এই ধরনের ঘটনায় বিশ্বাস করে। কারন এই ধরনের অধিকাংশ আমেরিকানবাসীদের সবচেয়ে ভয়, রাশিয়া এবং সৌদি আরবিয়া এখন একসাথে কাজ করছে, একটি প্রাচীন ইসলামিক বস্তুকে অস্ত্রে পরিণত করার জন্য যাতে তাদের বিরুদ্ধে বিনাশকারী শক্তির ব্যবহার করতে পারে এটা তাদের মনে বিশেষ ভীতির সঞ্চার করবে।

অর্থোডক্স চার্চের একটি প্রাচীন ম্যানুস্ক্রিপ্ট সংগ্রহ করে রাখা আছে যা দিয়ে এই আর্কটিকে পরিচালনা করা যায় -- এর সেরকম কোন ভালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও যেখান থেকে আর্ক্ অফ গেব্রিয়েল পাওয়া গিয়েছিল, সেই স্থানটি ঘিরে বহুকাল ধরেই একটি অতিপ্রাকৃতিক শক্তির ঘটনা ঘিরে রয়েছে। মধ্যযুগে রচিত 'আকবর আল জামান' নামক একটি আরবিক গ্রন্থ যা 1000 c e তে লেখা হয়েছিল, তাতে লেখা হয়েছিল 'অ্যাডামের পতনের পর গ্যাব্রিয়েল পৃথিবীর বুকে এসেছিল এবং
 তার কাছে 21 পৃষ্ঠার স্বর্গীয় বাণী প্রকাশিত হল। অ্যাডামের দেহকে মক্কার কাছে 'কেভ অফ ট্রেজার' নামক স্থানে দাফন করা হয়েছিল।' হিব্রু লোককাহিনী অনুযায়ী, এই স্থানটি সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীতে ভর্তি করা হয়েছিল। এই বইতে বলা হয়েছিল, অ্যাডামের পুত্র শেঠ এরপর আরো 27 টি পৃষ্ঠার দৈব বাণী পেয়েছিল এবং তাকে আদেশ দেয়া হয়েছিল মক্কায় প্রথম মসজিদটি বানানোর যা বিখ্যাত বন্যার পর আব্রাহাম পুনঃ নির্মাণ করেছিল। 




যদিও এই প্রাচীন লেখাগুলিতে আর্ক অফ গ্যাব্রিয়েলের কথা সরাসরিভাবে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি; কেউ কেউ দাবি করে বিখ্যাত বই 'বুক অফ ইনখ' এ আর্কের কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। থিওরিটিক্যালি  এটা সম্ভব হতে পারে কারণ মনে করা হয়, 'আকবর আল জামান' গ্রন্থটি তার বেশিরভাগ তথ্যগুলো এই 'বুক অফ ইনক' থেকেই সংগ্রহ করেছিল। যদিও বাস্তবিক ভাবে আমরা যা ভেবে নিতে পারি -- হয়তো সৌদি আরবিয়া এবং রাশিয়ার একসাথে মিলিত হয়ে পৃথিবীর ধ্বংস সম্পর্কিত কার্যকলাপে কোন যোগাযোগ নেই, কিন্তু এই কাহিনীর এমন কিছু পর্যায় আছে যা সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। এছাড়া এরমধ্যে আন্টার্কটিকার উল্লেখ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। 

যখন ভ্লাদিমির স্কি জাহাজটি জেডা থেকে আন্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল, ঠিক তখনই রাশিয়ান অর্থোডক্স নেতা পেত্রিয়ার্ক কিরিল নিজে আন্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে একটি অভিযান করেছিলেন এবং প্রচুর মিডিয়া বা গণমাধ্যমকেও এখানে নিয়ে আসা হয়। অনেকে বলেন, অ্যান্টার্কটিকায় অপার্থিব আচার অনুষ্ঠান গুলি থেকে এবং জাহাজটি থেকে গণমাধ্যমকে দূরে রাখার ও ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, আন্টার্কটিকা আসলে আটলান্টিস -- হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার বেঁচে থাকা অংশ যা হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন সভ্যতার বাসস্থান ছিল এবং এই সভ্যতাটি অপার্থিব এলিয়েন টেকনোলজির আঁতুড়ঘর ছিল এবং এখানেই অনুনাকির দেহ সংরক্ষিত করে রাখা আছে। পরিবেশগতভাবে ভয়ঙ্কর এবং দুর্গম অঞ্চল হওয়ার কারণে এই স্থানটি আমাদের গ্রহের গুপ্ত কার্যকলাপ গুলি করার পক্ষে আদর্শ স্থান।

আপনার কি মনে হয়?

Friday, 11 September 2020

মধ্যপ্রাচ্যের রহস্যময় শহর ও শয়তান --

*** প্রথমেই বলে রাখি আমার এই লেখাটি বিভিন্ন তথ্য সূত্র থেকে সংগ্রহ করা,  সবকিছু সম্পূর্ণ সঠিক হবার দাবী রাখি না এবং দয়া করে পুরোটা না পড়ে ও বুঝে মূর্খের মতো মাথা গরম করবেন না। কোন সংশয় থাকলে ইন্টারনেটে সার্চ করতে পারেন এবং কোন ভুল থাকলে সেটি জানালে উপকৃত হব।

পেত্রা, দক্ষিণ জর্ডানে অবস্থিত একটি সুন্দর এবং ঐতিহাসিক ও আর্কিওলজিকাল শহর। বহু বছর ধরে গবেষণার পরেও শহরটি সম্পর্কে তেমন বেশি তথ্য পাওয়া যায় না।

এখানে একটি বিখ্যাত ঘটনা ঘটেছিল যখন ক্রুসেডের সময় নাইট টেম্পলাররা এই শহর দখল করে।  তারা বিশ্বাস করতো হারিয়ে যাওয়া 'আর্ক অফ দি কভেনান্ট' এখানে কোথাও লুকানো আছে; যদিও বর্তমানে পেত্রা রহস্যময় নাবাতিয়ানস নামক যাযাবর গোষ্ঠীর কাহিনীর সাথে যুক্ত।

আরবিয়ান পেনিনসুলার অপরপ্রান্তে এই রহস্যময় নাবাতিয়ান গোষ্ঠীটির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। এরাই এই শহরটি এবং এর অসাধারণ স্থাপত্যগুলি তৈরি করেছিল - এক ধরনের বিশেষ আকৃতির প্লাটফর্ম এবং স্থাপত্য যা আশেপাশের কোন অঞ্চলে দেখা যায়নি। 


আর্কিওলজিস্ট সারা-পার্ক-আক প্রথম এই প্লাটফর্ম জাতীয় অস্বাভাবিক রকমের স্থাপত্যটি খুঁজে পান এবং এর জন্য তাকে হাই রেসোলিউশন স্যাটেলাইট ইমেজ এবং এরিয়ার ড্রোন ফটোগ্রাফির সাথে বিশেষ সার্ভে করতে হয়েছিল। কারণ, এটি নিচের থেকে অর্থাৎ ভূমির থেকে বোঝা যায় না।

তিনি বলেছিলেন, "এটি বিশাল আকৃতির একটি স্থাপত্য। এটি খুবই অসাধারণ একটি স্থান; আপনি সেখানে যেতে পারেন এবং সেখান থেকে শহরের কেন্দ্রস্থল টি দেখতে পারেন। আপনি সেখানে গেলে  বিভিন্ন আকৃতির বিভিন্ন ধরনের বিল্ডিংয়ের উপস্থিতি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন, যা খনন করে আবিষ্কার করা দরকার এবং এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, এটি কেবল মাত্র মূল শহরের এক কিলোমিটার দক্ষিণের অংশ। এটা এখন অব্দি পাওয়া সবচেয়ে বিশাল আকৃতির মনুমেন্টাল প্লাটফর্ম গুলোর মধ্যে একটি। এটি নাবাতিয়ান থেকে রোমান সময়কালীন পুরাতন হতে পারে এবং  আপনি যদি এই স্থাপত্যর উপরে যান তাহলে আপনি মূল শহরটি দেখতে পারবেন। কিন্তু মূল শহর থেকে এই স্থাপত্যটি দেখতে পাবেন না।"


এই স্থাপত্যটি সব রকম দিক থেকেই অসাধারণ রকমের এবং কেবলমাত্র এর আকৃতি বা গঠনের জন্য নয়, এটি তৈরি করা হয়েছিল অতিপ্রাকৃত বা দৈবিক কারণের জন্য। যদিও পার্ক  এর মতো আর্কিওলজিস্টরা এই স্থানে কোন অস্বাভাবিক উপাদান পাননি; তাদের মতে হয়তো আচার-অনুষ্ঠানের কারণে এই স্থানটি তৈরি করা হয়েছিল। 

থিওরিস্ট ক্রিস্টোফার এভারিট এবং 'এনিগমা চ্যানেল' নামক তার সংস্থা, তার আর্কিওলজিস্ট টিমের সাথে গবেষণা করে জানান, এই প্লাটফরমটি আসলে একটি আবরণ বা ঢাকনা হিসাবে বানানো হয়েছিল; যাতে এর ভিতরে থাকা দানবীয় শক্তিকে আটকে রাখতে পারে। তিনি এ বিষয়ে 'বুক অফ এনক্' এর কথা উল্লেখ করেন, যা প্রফেট ইদ্রিস এর দ্বারা রচিত। যাকে মুসলিমরা আদমের পর দ্বিতীয় প্রফেট হিসাবে বিশ্বাস করেন। 

এভারিট দাবি করেন, শয়তান এবং তার দানবীয় সেনাবাহিনীকে তলবিহিন কুয়া বা গর্তে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তার এই দাবির স্বপক্ষে তিনি বলেন, এনখ এর অনেক স্থানেই নরক বা 'Hell' কে 'টার্টাস' হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে যার সমার্থক শব্দ - 'তলবিহীন কুয়া বা গর্ত' এবং বিশাল আকৃতির পাথরের প্লাটফর্মের বর্ণনা আছে যা গর্ত ঢাকা দিতে ব্যবহার করা হয়। এই বর্ণনাগুলি পেত্রার এই আবিস্কারের সাথে মিল খায়। 

"এমন একটি স্থান যেখানে শয়তানকে হাজার হাজার বছরের জন্য বন্দি করা হবে।" 

এভারিট উল্লেখ করেন, বুক অফ এনোক এ লেখা আছে - " angels ful off sin, were sons of God, who  went after strange flesh, were punished and imprisoned in chains, in darkness, until the time of the judgement of the Great day". - they were cast into a pit, and a giant stone was used to close the the abyss..."


প্রথমের দিকে 'এনিগমা' লেবাননের 'বালবেককে' এই গর্তের অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করে কিন্তু জর্ডানের এই স্থানটি আবিষ্কারের পর তারা তাদের সকল মনঃসংযোগ পেত্রায় কেন্দ্রীভূত করেন। এই স্থানের অতিপ্রাকৃতিক গুরুত্বর প্রমাণ হিসাবে তারা দাবি করেন যে, নাবেতিন সভ্যতা প্রাচীন ইজিপশিয়ান এবং 'pre-islamic' সিরিয়ানদের মত ম্যাজিক এর ব্যবহার করত আত্মাকে ডেকে আনতে,  তাদের আচার-অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে  যাকে তারা অশুভ বা দুষ্ট বলে উল্লেখ করতো। যেমন - অনেক প্রি ইসলামিক সভ্যতায় নিয়মানুযায়ী পশু ও মানুষের হাইব্রিডকে আধ্যাত্বিক দেবতার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হত। এরকম একটি পশু যা নাবাতিয়ানদের বিশ্বাসে ছিল তা হল - ছাগল। এই প্রাণীটি ক্রিশ্চান এবং পেগান উভয় আইকনোগ্রফিতেই আছে এবং প্রায়শই একে সরাসরি শয়তানের সাথে যুক্ত করা হয়। ইসলামের এই সময়কে উল্লেখ করা হয় 'এজ অফ ইগনোরেন্স' হিসাবে। আরবিয়ান পেনিনসুলাতে মনোথিসম পুনরায় প্রবর্তন করার আগের একটি লম্বা অন্ধকার যুগ। 

এনিগমা অনুযায়ী এই প্রাচীন সভ্যতায় ঘোড়াকে সৌরমণ্ডলের দেবতাদের নিদর্শন হিসাবে দেখা হয় এবং উটকে দানবীয় হিসাবে। নাবাতিয়ানরা শিং যুক্ত প্রাণীদের চকের তৈরি মূর্তি বানিয়ে ছিল। যেমন - ছাগল, ভেড়া - যা শক্তি এবং সামর্থের নিদর্শন এবং এর থেকে একটি ধারণা উঠে আসে যে শয়তান এক ছাগলের মাথা যুক্ত প্রাণী হিসেবে। তাহলে শয়তানকে পেত্রার তলায় বন্দী রাখা হবে - এই থিওরীর সমর্থনে কি প্রমান থাকতে পারে? 
এভারিটের কাছে এর সঠিক উত্তর নেই তবে, হয়তো আমরা এই ব্যাপারে অনুমানমুলক কিছু বলতে পারি। ...


আরবিয়ার দক্ষিণ প্রান্তে ইউনাইটেড আরব এমিরেটস, ইয়েমেন এবং সৌদি আরবিয়ার মাঝামাঝি 'ইদেম' নামে একটি শহর আছে। শোনা যায়  হারিয়ে যাওয়া দানবদের এক উপজাতি এখানে একসময় বসবাস করত। নাবাতিয়ানদের মতই হয়তোএই অত্যন্ত উন্নত প্রজাতির প্রাণী একসময় এখানে রাজত্ব করত। অনেক ঐতিহাসিক' লেখায় তাদের উল্লেখ পাওয়া গেছে। যেমন- সিরিয়ায় 1970 সালের কাছাকাছি পাওয়া 'কিউনিফর্ম' বা 'পিপল অফ এডি'  থেকে শুরু করে হোলি কোরআনের বিভিন্ন ভার্স এ নাবাতিয়ান এবং ইদেম এর অস্তিত্ব আলাদা আলাদা সময়কালিন থাকলেও এটা হতে পারে যে আরবিয়ার একই স্থান থেকে তাদের উৎপত্তি। 

অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন যে, নাবাতিয়ানরা পেত্রাকে তৈরি করেছে সেই সকল দেবতার মতো সত্তাদের জন্য যাদের তারা উপাসনা করত অথবা সেই সকল দানবদের জন্য যাদের সাথে তারা বসবাস করত, কারণ এখানকার স্থাপত্য দরজা ও পথগুলি অত্যন্ত উঁচু এবং প্রশস্ত।

মনে করা হয়, তাদের এই জ্ঞান দিয়ে তারা সেই সকল অতি প্রাকৃতিক শক্তির সাথে যোগাযোগ করত যা আমাদের ধারণারও বাইরে এবং যে দানবদের পেত্রায় বন্দী করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, হতে পারে তারা পৃথিবীতে থাকা দানবদের পূর্বপুরুষ - খ্রিষ্টান থিওলজিতে তাই মনে করা হয়। 

'ডেড সি স্ক্রল' অনুযায়ী, এর 'বুক অফ জায়েন্ট' এ উল্লেখ করা হয়েছে, শয়তানকে 'আজাজিল' নামে।  এটি 'এনখ' এর একটি অংশ। 'বুক অফ এনখ ' অনুযায়ী, সে বিদ্রোহী ফেরেশতাদের পৃথিবীর নারীদের সাথে মিলিত হতে দিয়েছিল এবং এরপর সেই মানবীরা এই সকল দানবদের জন্ম দেয়। 

ইসলামের কিছু পন্ডিত ব্যক্তি মনে করেন যে, আজাজিল এবং ইবলিশ উভয়ের অর্থই এক ; উভয়ই শয়তানের আরবিক নাম এবং সে এক ধরনের আল্ট্রা পাওয়ারফুল বা অত্যন্ত শক্তিশালী জিন যার Rank ও মর্যাদা ফেরেশতার মত। কোরআন অনুযায়ী, ইবলিশ মানুষকে সম্ভবত 'ডে অফ জাজমেন্ট' পর্যন্ত প্রলুব্ধ এবং দুর্নীতি পরায়ন করে যাবে। যদিও কোরআনের 'ইরেম এর জায়েন্ট' এবং বাইবেলের 'ফলেন এঞ্জেলস' বা 'বিদ্রোহী ফেরেশতাদের' মধ্যে থিওলজিকালী কোন লিংক করা হয়নি। তাহলে ইসলামিক, জিউস, ক্রিশ্চান অথবা আপোক্রিফা ধর্মগ্রন্থের কোন স্থানে এরকম কি কোন ধারনা আছে যে শয়তান এবং তার বিদ্রোহী ফেরেশতাদের সেনাবাহিনী কে পেত্রার নিচে কোথাও আটকে রাখা আছে? ইসলামিক পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে না বলা যায়। এদিকে মেইনস্ট্রিম ক্রিস্টিয়ান এবং ইহুদির দিক থেকে বিশেষ করে জর্ডনের কাছে এরকম কোন ঘটনা ঘটেছিল বলে উল্লেখ নেই। যদি আমরা ভুল হই তাহলে দয়াকরে কমেন্টে বলবেন।



এভারিট এর থিওরি যতটা রোমাঞ্চকর শোনায় সেরকম, অর্থাৎ একটি কারাগার যা পেত্রার তলায় দানবীয় সত্তাকে আটকে রাখে বা কখনো রেখেছিল, এর অস্তিত্ব সম্পর্কে সে রকম কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় না। শয়তান সত্তিকারের কিন্তু সম্ভবত পেত্রার নিচে তার কারাগারটি সম্ভবত নয়। কারণ, ধর্মগ্রন্থ এবং বিজ্ঞান কোন অংশে এই থিওরির স্বপক্ষে কিছু পাওয়া যায়নি এবং এই এলাকার কোন অতিপ্রাকৃতিক বা আধোদৈবিক তাৎপর্য সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই কিন্তু তবুও নাবাতিয়ানদের নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকে গেছে। 

পার্কারের মতে, এটা মনে রাখা খুবই জরুরি যে পেত্রার মত আর্কিওলজিক্যাল সাইট যা খুব গুরুত্বসহকারে পরীক্ষা করা হয়েছে, তবুও এত বছরের গবেষণার পর এর অনেক কিছু বাকি থেকে গেছে। পেত্রাকে বুঝতে এখনো অনেক বাকি এই শহরের 15 শতাংশ কেবলমাত্র পৌঁছানো গেছে এবং বেশিরভাগ অংশ অর্থাৎ বাকি 85 শতাংশ এখনো ভূগর্ভস্থ এবং পৌঁছানো যায়নি। 

আপনার কি মতামত ?

Sunday, 6 September 2020

মধ্যপ্রাচ্যের রহস্যময় প্রাচীন সমুদ্র দানব --

প্রাচীন এবং আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসের বিভিন্ন স্থানে সমুদ্রের দানবদের বর্ণনা পাওয়া গেছে ।  বর্তমানের কমিক বুকে 'একোয়া ম্যান' এবং 'এইচ পি লাভ ক্রাফট' এর মাছ এবং মানুষের মাঝামাঝি দেখতে এক প্রাণী যাকে 'ডিপ ওয়ান্' বলা হয়; এছাড়া আরবিয়ান নাইটের গল্পে দেখা যায়। 
এই গল্প গুলি কতটা সত্যিকারের হতে পারে?

বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে মিডিল ইস্ট এর সীমান্তে - ইরান, আজারবাইজান এবং রাশিয়ার মাঝামাঝি স্থানে ক্যাস্পিয়ান সি কে ঘিরে এই ধরনের প্রায় তিন প্রকার সমুদ্রের সাথে যুক্ত প্যারানরমাল কাহিনী ঘুরে বেড়াচ্ছে।  ঐতিহাসিক এই ঘটনাগুলির বৈজ্ঞানিক ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়নি। প্রথম অস্বাভাবিক বিষয়টি হলো ক্যাস্পিয়ান সি-এর ধারের বিভিন্ন শহরের অদৃশ্য হওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা; এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে 'খাজার খাগেনাতের' ঘটনা। এটি একটি শহর ছিল, যা এগারোশো শতকের দিকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল; কিন্তু হঠাৎ করে কোনো চিহ্ন ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনাটি এসেছিল এক প্রকার অবিনাশী হাঙ্গর বা সার্কের রূপে - যার মানুষের রক্তের প্রতি ভীষণ লোভ ছিল এবং তৃতীয়টি এসেছিল 90 দশকের প্রথম দিকে, এই সময় ইউ এফ ও এর দেখতে পাওয়ার একাধিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া গিয়েছিল। 



শেষ রহস্যটি এসেছিল এক প্রকার রহস্যময় প্রজাতির থেকে যাকে 'রুনান শাহ' বলে জানা যায়। 
এক ধরনের মনুষ্য রুপি সামুদ্রিক প্রাণী যা প্রচুর নাবিক এবং সমুদ্রের তৈলখনিতে কাজ করা শ্রমিকদের দেখা দিয়েছে বলে জানা যায়।  প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এরা নিজেদের আশেপাশের জল গুলি স্বচ্ছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এবং এদের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর মাছ দলবেঁধে ঘোরে। এই রহস্যজনক বস্তুটিকে জলে এবং স্থলে উভয় জায়গাতেই দেখতে পাওয়ার ঘটনা শোনা যায়।

2005 সালের মার্চ মাসে  'জিন্দেগি' নামক ইরানিয়ান সংবাদপত্রে এদের প্রত্যক্ষদর্শীর একটি বিবরণ প্রকাশিত হয় প্রত্যক্ষদর্শী বাকু নামক একটি জাহাজের কর্মী ছিল, যেটি ক্যাস্পিয়ান সিতে যাতায়াত করতো। একটি সাক্ষাৎকারের জাহাজের ক্যাপ্টেন জো ফার্গুসন দাবি করেন, এই প্রাণীটি বেশ কিছু সময় ধরে তাদের জাহাজের সাথে সাথে সাঁতরে যাচ্ছিল। প্রথমদিকে তারা ভেবেছিল এটা হয়তো কোন বিশালাকৃতির মাছ হবে; কিন্তু পরে তারা লক্ষ্য করেন, এর পাখনাগুলো অন্য ধরনের, দেহের উপরিভাগে দুটি হাতও দেখা যাচ্ছিল। এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই বিভিন্ন স্থান থেকে এই প্রাণী সম্পর্কে আরো বিভিন্ন বিস্তারিত বর্ণনা উঠে আসতে থাকলো। এগুলি সেই সকল প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে যারা অনেককাল ধরে কাস্পিয়ান সাগরের কর্মরত ছিলেন এবং বেশিরভাগ বর্ণনাগুলো একে অপরের সাথে মিলে যাচ্ছিল। যার ফলে এটি কোন কল্পিত বস্তু বলে মনে করা সম্ভব হচ্ছে না। সকল প্রত্যক্ষদর্শীরা এই মানুষরূপী প্রাণীটির বর্ণনা দিয়েছিল - এটি 5 থেকে সাড়ে পাঁচ ফুটের কাছাকাছি লম্বা এবং পেশীবহুল গঠন এর আংগুল এবং পা আছে এবং এর মাথায় কালো এবং সবুজ রঙের কেশ দেখা যায়। এদের নাকের আকৃতি অনেকটা ডলফিন এর চঞ্চুর মত। এর মুখ খুব বড় আকৃতির  এবং চোয়ালযুক্ত নয়। দুর্ভাগ্যবশত,  অনলাইনে এর কোন ফটো বা ভিডিও পাওয়া যায়নি এবং যে ফটো এবং ভিডিও গুলো দাবি করে এগুলি কাস্পিয়ান সি এর 'মারমেড' বা 'মৎস্য মানবের' ছবি সেগুলি কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা প্রশ্ন রেখে যায়।



এই প্রাণীগুলিকে প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বহুবার দেখা গেছে এবং তাই জন্য ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে বেশি তথ্য বা বিবরণসমৃদ্ধ রহস্যময় প্রাণীদের মধ্যে এরা উল্লেখ্য। 2004 সালে আসতারা এবং লের্নকুরান শহরের মাঝামাঝি গ্রামে বসবাসকারী এক মৎস্যজীবী এই রুনান শাহকে দেখার কথা জানায়। রাশিয়ান প্যারানরমাল এক্সপার্ট পল স্টোনহিল যিনি হিস্ট্রি চ্যানেলের 'এনসিয়েন্ট এলিয়েন্স' সিরিজের উল্লেখযোগ্য কন্ট্রিবিউটর ছিলেন, তিনি 2002 সালে দাবি করেন, এই বছরের জুলাই মাসে একজন আজারবাইজানের ব্যবসায়ী এবং তার গ্রিক অতিথিরা সমুদ্র ভ্রমণকালে দেখতে পান একটি ছোট নৌকায় এই দুই মনুষ্যরূপি সামুদ্রিক প্রাণী অন্য একটি সমুদ্রের প্রাণীকে কিছু খাওয়াচ্ছিল; কিন্তু তাদের একটু কাছে যাওয়ার পরেই তারা লাফিয়ে সমুদ্রে ডুবে যায়। ব্যবসায়ীটি এই সামুদ্রিক প্রাণী গুলোকে 'সোয়াদেল' নামে উল্লেখ করেন যার অর্থ - 'পিপল অফ দ্যা সী' বা 'সমুদ্রের বাসিন্দা' .
এছাড়াও স্টোনহিলের মতে, রাশিয়ার কাছের উত্তর কাস্পিয়ান সিএ কর্মরত তৈলখনির কর্মীদের কাছেও এই প্রাণীগুলি সুপরিচিত। 1980 সাল থেকে এই অঞ্চলে ড্রেজিংয়ের কাজ হয়ে চলেছে। এখানকার বহু কর্মীরা মনুষ্য রুপি সামুদ্রিক প্রাণীদের প্রত্যক্ষ বিবরণ দিয়েছেন। বেশিরভাগ মতেই এই প্রাণীগুলি ভীতু প্রকৃতির হয়ে থাকে; যদিও বেশ কয়েকবার এখানে কাজ করতে আসা মহিলাদের গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। এখানকার কর্মীরা এর জন্য এই সামুদ্রিক প্রাণীকে দায়ী করেছিল এবং একটি প্রত্যক্ষ বিবরণে জানা গিয়েছে, এক দম্পতি স্থলভাগের এই প্রাণীগুলির দ্বারা শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছিল।



কয়েক দশক আগে গেলেও কাছাকাছি কাবিলিয়া এবং রাশিয়াতে এই রুনান শাহএর বিবরণ পাওয়া যায়। 1928 সালে 'লেক অফ ভেদলোজেরও' এর স্থানীয় বাসিন্দারা পরপর বেশ কিছু সময় ধরে এই প্রাণীদের দেখতে পাওয়ার ঘটনা দাবী করতে থাকেন এবং পেত্রজাভোডসক ইউনিভার্সিটির এক গবেষক দল এখানে ঘটনাটির তদন্ত করতে আসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল গোপন করে রাখা হয় এবং এই গবেষক দলের সদস্যদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়।  1930 সালের সময়কালীন সোভিয়েত লেবার ক্যাম্পে তাদের মৃত্যু ঘটে।

লিখিতভাবে সবচেয়ে প্রথম দিকের বর্ণনা গুলির মধ্যে একটি পাওয়া যায় কাফর্নিয়া নামক এক আরবের ঐতিহাসিকের লেখায়; আনুমানিক প্রায় 894 খ্রিস্টাব্দে সমকালীন তিনি 'আজা এল মালকোকত' নামক তার গ্রন্থে এক প্রকার মৎস্য মানবের বিস্তারিত বিবরণ দেন, যা পরবর্তীকালে 1871 সালে 'চিকাগো ফিল্ড নিউজলেটারে' প্রকাশিত হয়। তার বর্ণনা অনুযায়ী, কাস্পিয়ান সমুদ্রে একটি বড় মাছ ধরা পরে এবং প্রিন্স সেলিমের উপস্থিতিতে একে উন্মুক্ত করা হয় এবং এর ভেতরে একটি মৎস্য মানব পাওয়া যায়। "এই প্রাণীটি এক ধরনের পাজামা জাতীয় পোশাক পড়েছিল, যা চামড়ার তৈরি ছিল এবং তার হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ছিল. সে তার হাতটি কখনো মুখের উপর রাখছিল আবার কখনো তার চুলের ওপর এবং খুব ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল; কিন্তু বেশিক্ষণ জীবিত থাকতে পারেনি।"



'মিস্টেরিয়াস ইউনিভার্স' ওয়েবসাইট অনুযায়ী, 1998 সালে স্যামদ জাফারভ নামে এক ফিশ পোচার এক হাঙ্গর এর মত রহস্যময় প্রাণীর বর্ণনা দেয়, যা তাঁর এবং তাঁর সঙ্গীদের আতঙ্কিত করে তুলেছিল। কাস্পিয়ান সাগরের পূর্ব দিকে ফোর্ট চিভস্যাঙ্কর কাছে তার বন্ধুকে নিয়ে স্পিয়ার ফিশিং এ বেরিয়েছিযেন। এই সময় তারা টর্পেডোর মত বিশালাকৃতির মাছ দেখতে পেয়েছিল। প্রথমে তারা ভেবেছিল এটি কোন হাঙ্গর হতে পারে এবং তার বন্ধুটি সেই প্রাণীটির মাথায় স্পিয়ার বা ভালা ছুড়ে মেরেছিল কিন্তু সে ব্যর্থ হয়েছিল এবং এই প্রাণীটি তার সেই ভয়ঙ্কর চোয়াল দিয়ে তার বন্ধুটিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল। এই সময় সে কোনোক্রমে নৌকাটি সমুদ্রের ধারে নিয়ে আসতে সক্ষম হয় এবং অন্যান্য কর্মীরা তাকে টেনে বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।  সঙ্গে সঙ্গে তাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাকে ব্লাড ট্রান্সফিউশন দেওয়া হয় এবং তার একটি পা হাটু থেকে কেটে বাদ দিতে হয়। যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, তাকে কে আক্রমণ করেছিল; তার মতে এটি কোনোভাবেই হাঙ্গর হতে পারেনা। এটা ঠিক যে, কাস্পিয়ান সিএ কোথাও হাঙ্গর থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।



এছাড়াও 90 দশকের প্রথম দিকে ইউ এফ ও দর্শনের বিভিন্ন ঘটনা এই অঞ্চলটিকে একটি রহস্যময় স্থান করে তুলেছে।  2017 সালে তুর্কির ভ্যান ইউনিভার্সিটি ভ্যান লেকের তলায় 3000 বছরের পুরনো আর্মেনিয়াম ক্যাসেলের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। এর ফলে এই অঞ্চলে একটি সরকারি তদন্ত শুরু হয়। তাদের মতে, আজারবাইজান এবং বাকুর কাছাকাছি ক্যাস্পিয়ান সি এর গভীরে এরকম বহু রহস্যময় শিলালিপি সমৃদ্ধ পাথর খুঁজে পাওয়া গেছে। এইগুলি একটি আইসল্যান্ড এবং দুর্গের আশেপাশে পাওয়া গেছে।  1306 সালে এক ভূমিকম্পের কারণে গঠিত সুনামিতে এগুলির সমুদ্রে তলিয়ে যায়। গবেষক এবং ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে এই লিপিগুলি পার্শিয়ান এবং আরবিক এ লেখা, কিন্তু দুর্বোধ্য। যতটা উদ্ধার করা হয়েছে, শতানীক শক্তি এবং প্রাকৃতিক ধ্বংসাত্মক শক্তিগুলি থেকে রক্ষা করার জন্য এই স্থানটি কোন প্রাচীন প্রযুক্তিতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল।
কিছু কিছু শিলায় মানুষের, পশু পাখি,র দানবের এবং এলভদের চিত্র পাওয়া যায়। এগুলি এই অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উভয় প্রকার সত্তার বিবরণ দেয়। মনে হয়, প্রাচীনকালের এই অঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দারা নিয়মিত এই রহস্যময় সামুদ্রিক প্রাণী গুলির সম্মুখীন হতো এবং তাদের থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য যাদুবিদ্যার সাহায্য নিত। এই আবিষ্কারগুলি এবং এই অঞ্চলের রহস্যময় প্রাণীদের ধর্ষণের ঘটনা একটি থিওরি এনে দেয় যা বর্ণনা করে, হয়তো এখানে অর্থাৎ কাস্পিয়ান সাগরের তলায় এম্ফিবিয়ানদের একটি সম্পূর্ণ সভ্যতার অবস্থান ছিল বা আছে।



অনেকেই মনে করে এই অস্বাভাবিক ঘটনাগুলি সুপারন্যাচারাল এবং ইকোলজিক্যাল হুমকি বা সতর্কতা। সাম্প্রতিক কিছু বছর ধরে ক্যাস্পিয়ান সাগরে তৈল উৎপাদন এবং সমুদ্রের তলার আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার কারণে ফ্লোরা এবং ফনার রিপ্রোডাকশন ভয়ানক ভাবে কমে গিয়েছে। কিছু স্থানীয় আজহারী মাঝির মতে এই অঞ্চলে তৈল উৎপাদনে নিরন্তর ড্রিলিং এর ফলে একটি শক্তিকে জাগিয়ে তুলেছে যা মানুষের ধারণারও বাইরে এবং এই শক্তিগুলি সমুদ্রকে তার ইকোলজিক্যাল ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যবস্থা নেবে.....

আপনার কি মনে হয়?

Sunday, 30 August 2020

আসাসিন্স অর্ডার পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম গুপ্ত সঙ্ঘ

*** প্রথমেই বলে রাখি এই লেখাটি আমরা বিভিন্ন সূত্র, কাহিনী, তথ্য অবলম্বন করে লিখেছি এর পুঙ্খনাপুঙ্খ সত্য হওয়ার দাবি রাখিনা তবে বেশিরভাগ সূত্রে যা মিল পেয়েছি অর্থাৎ যা বেশি বিশ্বাসযোগ্য, তুলে ধরেছি। দ্বিতীয় - বলতে চাই এখানে আমরা কাউকে খারাপ বলতে চাইনি, দয়া করে পুরোটা ঠান্ডা মাথায় পড়লে বুঝতে পারবেন, আধা পরে মূর্খের মতো মাথা গরম করবেন না। তৃতীয়, যদি এ বিষয়ে কিছু তথ্য ও সূত্র ভুলত্রুটি হয় বা উল্লেখ না থাকে কমেন্টে বললে উপকৃত হবো এবং ভালো লাগলে আরো বিস্তারিত ভাবে এরপর একদিন আস্সাসিন্সদের ইতিহাস নিয়ে লেখা দেব।  

এক সময় 'হাশাশিন' কে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও নৃশংস গুপ্তসংঘ হিসাবে মনে করা হতো।  তারা প্রসিদ্ধ হয় তাদের শিকারকে খুঁজে বের করা এবং রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য, সে যত পরিমাণে নিরাপত্তা ও আশ্রয় ঘেরা থাকুক না কেন। কিন্তু 1258 সালে মঙ্গলরা পৃথিবী থেকে তাদের প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছিল বলে জানা যায়। পুঁথিগত ইতিহাস বলে 13 শতকের শেষের দিকে এই সংঘটির অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু ইতিহাস বই  ভুল হতে পারে। 
হতে পারে তাদের মধ্যে যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদের পরবর্তী উত্তরাধিকারীরা একুশ শতক অব্দি গোপনভাবে এই সংঘটিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে? এবং যদি এই অ্যাসাসিন অর্ডার আজও বর্তমান থাকে তবে কি সেটি একই রয়েছে নাকি বর্তমানের অন্য কোন নামে সেটি পরিচালিত হচ্ছে এবং এরা কি এখনো একইরকম ভয়ানক ও রহস্যময় আছে নাকি এদের চিন্তা ধারা বা ভাবাদর্শ বিবর্ধিত হয়ে পরিবর্তন ঘটেছে ?



যাই হোক না কেন ইতিহাসের পাতায় আজ পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়ানক সিক্রেট সোসাইটির গড়ে ওঠা ও প্রকাশ পাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, ইসলামের নিজরা ইসমাইলি সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ্য। এই সম্প্রদায় তার বিপ্লবী কার্যকলাপের মাধ্যমে সুন্নি এবং শিয়া উভয়ের মধ্যেই নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। এই সম্প্রদায় প্রথমদিকে ধর্মের আড়ালে বছরের পর বছর নিজের কার্যকলাপ চালিয়ে গিয়েছিল এবং গোপনে গোপনে 'দাইস' নামক তাদের ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে তাদের আদর্শ ও চিন্তাধারা প্রচার করে যাচ্ছিল। এই সবকিছু চলছিল যতদিন না এই 'দাইস' দের মধ্যে 'হাসান ই সাবাহ' নামক একজন ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হয়ে উঠলো। এইভাবে 'অর্ডার অফ অ্যাসাসিন' অথবা যাকে 'হাশাশিন অর্ডার' বলা হয় তা জনসমক্ষে উঠে এলো।

 ইরানের 'আলবর্জ' পর্বতের উপরে প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হিসাবে অর্ডারের স্থাপন করলেন, হাসানের পরিচিতি পায় - 'ওল্ড ম্যান অফ দা মাউন্টেন' হিসাবে এবং এই নামের সাথে কেবল অ্যাসাসিন গুপ্তসংঘের রহস্যগুলি বৃদ্ধি পায়নি, তার সাথে হাসানের নিজস্ব অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার কাহিনী শুরু হলো। তার শাসনকালে তিনি তার সমর্থকদের মধ্যে থেকে এক বাছাই করা সেরা সৈন্যদল গড়ে তুললেন। 'দা ফিদাইন' যারা বিশেষ প্রশিক্ষিত খুনি হিসাবে গড়ে উঠেছিল এবং পরবর্তী 200 বছর ধরে বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল। ক্রুসেডের প্রথম এবং পরের দিকে যেমন 1122 সালে ফাতিমার মন্ত্রী আল আফজাল, 1124 সালে ইবন আল খাসবাপ (যিনি ক্রুসেড চলাকালীন বিশ্বের প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্ব ছিলেন), 1152 সালে 'রেমন্ড 2 কাউন্ট অফ ত্রিপোলি', 1892 সালে জেরুজালেমের রাজা 'কনার্ড অফ মন্টফেরাত' এবং 1271 সালে 'প্রিন্স এডওয়ার্ড' কে হত্যা প্রচেষ্টা করা হয় - তিনি এসাসিনের বিষাক্ত ছুরিতে জখম হন। এই অর্ডারটি খুনি যোদ্ধাদের সংস্থা ছিল - যারা বিশ্বাস করত তাদের নেতাদের জন্ম থেকেই অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে, যা বেশিরভাগ মুসলিমরা জানেনা। 'ফিদাইন' শব্দের অর্থ করলে দাঁড়ায় - যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নেয়।


যেখানে মনে করা হয় 'এসাসিন' শব্দটি 'হাশাশিন' শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে অনেকে বলে হাশাশিন শব্দটি 'হাসিস' নামক ড্রাগ বা মাদক থেকে এসেছে কিন্তু এটা ঠিক নয় অনেক পণ্ডিত এ নিয়ে বিতর্ক রেখেছেন যে, আসলে 'হাসিস ইটার' বা হাসিস সেবক - এই কাহিনীগুলি  নিজরা ইস্মাইলির শত্রুরা বা নিন্দুকরা বানিয়েছে এবং তখনকার কোন মুসলিম ঐতিহাসিকের বিবরণে এগুলি ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়া হাসান - ই - সাবাহ ব্যক্তিগতভাবেও মাদক সেবন করা প্রশ্রয় দিতেন না। হাশাশিনদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেক রকম দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও বিখ্যাত অভিযাত্রী 'বেঞ্জামিন অফ টুডে' এবং 'মার্কোপোলোর' কয়েকশো বছর আগের বর্ণনা অনুযায়ী এর বেশির ভাগগুলি ধোঁয়াশায় পূর্ণ কল্পকাহিনী বা শ্রুতিকথার মত ছিল। যদিও অর্ডারটির এই রহস্যময় অতিপ্রাকৃতিক কার্যকলাপগুলির  উৎস এবং কতটা কাল্পনিক তা বিতর্কিত এবং বর্তমান কালেও এই অর্ডারটি রহস্যময় উৎস নিয়ে কৌতুহল থেকে গিয়েছে।


হাসান ই সাবাহর নেতৃত্বে অর্ডারের প্রথম শিকার ছিল 'আবু আলী হাসান ইবন আলী টুসি' নামক একজন খুব উচ্চপদস্থ পার্শিয়ান মন্ত্রী। 1092 সালের অক্টোবরের এক সকালে সে তার একজন অনুগামীকে শান্তিপ্রিয় সুফি সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে আলী টুসির ভারী প্রহরা যুক্ত অনুগামীবলয় ভেদ করতে পাঠিয়েছিল এবং এরপর বুক অর্থাৎ হৃৎযন্ত্রে  ছুরি ঢুকিয়ে এই মন্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাটি এলাকায় একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল; কারণ হাসান দেখিয়ে দিয়েছিল সে যে কোন জায়গায় ঢুকে যত সুরক্ষিত হোক না কেন তা ভেদ করে যে কাউকে শিকার বানানোর ক্ষমতা রাখে।   এই প্রথম হত্যাটির সাথে সাথে হাসান নিজরা ইসমাইলি সমাজ থেকে একটি সেরা গুপ্ত যোদ্ধাদের জাতীয় সংগঠন তৈরি করতে অনুপ্রাণিত হলো। যারা সকলেই একই ভাবে কাজ করে যেতে পারবে এবং খুব বেশি দিন না এগারোশো শতাব্দীর মধ্যেই এই হাশাশিন অর্ডারটি যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করল এবং যথেষ্ট ভয়ের সঞ্চার করল। 

বারোশো শতাব্দীর প্রথমদিকে অর্ডারটি তাদের কার্যকলাপ সিরিয়া পর্যন্ত প্রসারিত করেছিল। তারা আন-নুসরা পর্বতের কিছু দুর্গ দখল করেছিল; তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল মাসায়াফ।  এখানে সিরিয়ার নিজেরা ইসমাইলি সম্প্রদায়ের গ্র্যান্ডমাস্টার রাশিদ আস সিনান শাসন করতেন এবং এখানেই তাঁর পরিচিতি পায় 'ওল্ড ম্যান অফ দা মাউন্টেন' হিসাবে।  তবে রাশিদ আস সিনান এবং হাসান ই সাবাহ - এরা কি একই ব্যক্তি ছিলেন নাকি  দুজনেই এক  খেতাব পেয়েছিলেন এ সকল কিছু নিয়ে আরব এবং পাশ্চাত্যের দেশের মধ্যে বিতর্ক থেকে গিয়েছে। তবে আমরা এখানে হাসানকে নিয়ে এগোতে পারি এবং সিরিয়ায় সেই স্থান যেখানে আমরা এই ওল্ড ম্যান এর প্যারানরমাল ক্ষমতার উদাহরণ গুলো প্রথম দেখতে পাই। 
কিছু কিছু সূত্র দাবি করে হাসান অ্যালকেমিতে এক উল্লেখযোগ্য বিশেষজ্ঞ ছিল। এটি এক রকমের যাদুবিদ্যার ভাগ এবং বলা হয় তিনি হাশাশিন অর্ডারকেও  এতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত করেছিলেন। বিভিন্ন গুপ্ত বিদ্যা যেমন নক্ষত্রবিদ্যা এবং বিভিন্ন রকম মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতায় দক্ষতা অর্জন করতে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। একটি স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, তার এমন আধোদৈবিক ক্ষমতা ছিল যার দ্বারা তিনি পৃথিবীর যে কোনো স্থানের ঘটে চলা ঘটনার ওপর প্রভাব বিস্তার বা কারসাজি করার ক্ষমতা রাখতেন।


চৌদ্দশ শতকের ইসমাইলি লেখক আবু ফিরাস তাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি কাহিনী সংগ্রহ করেছিলেন। তার লেখা অনুযায়ী, যখন 'ওল্ড ম্যান' প্রথম ছদ্মবেশে সিরিয়ায় এসেছিলেন, তার 1 সঙ্গী লক্ষ্য করেন তার কোন প্রতিচ্ছবি বা ছায়া মাটিতে পড়ছিলো না - ঠিক ভ্যাম্পায়ারের বা ডাইনীর মত। ওল্ড ম্যান তার সঙ্গীটিকে এই ব্যাপারে কখনো কাউকে বলতে নিষেধ করেছিল। পরবর্তীকালে সেই সময়কার সিরিয়ানদের কাছে তার এই দৈবিক ক্ষমতা গুলি ধীরে ধীরে সুপরিচিত হতে থাকে। আবু ফিরাস 'ওল্ড ম্যান' এর এরকম অনেক টেলিপ্যাথিক ক্ষমতার অকল্পনীয় গল্পগুলি লিখেছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা গুলি হল - 'প্রিকগনিশন' অর্থাৎ ভবিষ্যতের ঘটনা দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা, 'মাইন্ড রিডিং' বা মন পড়ার ক্ষমতা এবং মাইন্ড কন্ট্রোল অর্থাৎ মনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এই সময়কার বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যতে এর উল্লেখ পাওয়া গেছে যে, তিনি এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তার নিজস্ব অনুগামীদের মন নিয়ন্ত্রণ করতেন - 'এইভাবে তাহারা পাহাড়ের উপরের দুর্গে আশা আগন্তকদের ভয় দেখাতেন', জানা গেছে তিনি ফিসফিস করে তার নিযুক্ত কোন এক অনুগামীকে কিছু বলতেন এবং সে কোন কিছু চিন্তা না করে দুর্গ থেকে ঝাঁপ দিত। এই অর্থহীন আত্মহত্যার কোন মানে না থাকলেও এগুলি মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি ও প্রভাব বিস্তারে সাহায্য করত। 

এরকমই একটি দারুন গল্প কিংবদন্তি যোদ্ধা সালাদিনকে ঘিরেও রয়েছে। 1176 সালে সালাদিন এই নিজারি ইসমাইলি অনুগামীদের অনেকাংশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল এবং ওল্ডম্যানের পর্বতের আশ্রয়কে হামলা ও দখল করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গিয়েছিল। এমনকি এক রাত্তিরে সালদিনের সৈন্যরা ওল্ড ম্যান এবং তার ব্যক্তিগত রক্ষীদের সামনে আসতে সক্ষম হয় কিন্তু তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়।  তারা বলেছিল যে কোন এক অদৃশ্য শক্তি এই নেতা এবং তার রক্ষীদের ঘিরে রেখেছে, যা তাদের রক্ষা করছে। যদিও এটি একটি অদ্ভুত বিষয়, কিন্তু সালাদিন নিজে বলেছিলেন যে তিনি সেই সময়ের রাত্তির গুলিতে অদ্ভুত অদ্ভুত ভয়ানক স্বপ্ন দেখছিলেন এবং শেষে এক দিন ঘুম থেকে উঠে তিনি তাজা সেকা পাউরুটি (যা শোনা যেত অ্যাসাসিনরা বানাত) এবং তার বিছানার পাশে একটি বিষাক্ত ছুরি দেখতে পান। যদিও এটা কতটা সত্যি তা জানা যায়নি কিন্তু এটা ঠিক যে সালাউদ্দিন তাদের নিশানায় পড়ে যায়। ইতিহাসের বই থেকে জানা যায়, তিনি দুইবার ওল্ড ম্যান এর হত্যার প্রচেষ্টা থেকে বাঁচতে সক্ষম হন এবং তারপরেই সেই কিংবদন্তি পাউরুটি এবং বিষাক্ত ছুরির গল্প শোনা যায় এবং তারপর তিনি তার দুর্গ ঘেরাও তুলে দেন এবং খুব দ্রুত হাসান এর সাথে একটি নতুন সমঝোতায় আসেন, অবশেষে হাশাশিন আদর্শের উপর স্বাধীনতা মেনে নেন। এইভাবে অর্ডারের আরো দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা এবং তাদের ঘিরে থাকা সেই রহস্যময় খ্যাতি গুলির বর্তমান থাকা নিশ্চিত করেন। সুতরাং সেই প্রশ্ন থেকেই যায় কত সময় ধরে এই রহস্যময় অর্ডার টিকে ছিল নাকি তারা আজও চারিদিকে আছে। 

গতানুগতিক ইতিহাস অনুযায়ী হাশাশিন অর্ডার তেরোশো শতকের মাঝামাঝি মোগল সাম্রাজ্য দ্বারা নিঃশেষ হয়ে যায় এবং খুব সম্ভবত বেঁচে যাওয়া সদস্যরা ইউরোপ, মিডিল ইস্ট, নর্থ আফ্রিকা এবং এশিয়ার উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পুঁথিগত ভাবে জানা গেছে তাদের শেষ বংশধর 16 শতকে মারা যায়। কিন্তু গুজব অনুযায়ী, হাসাসিনরা একটি নতুন অর্ডারের মাধ্যমে পুনরায় জীবিত হয়ে ওঠে, এই অর্ডারটির নাম ছিল 'রশিনায়া' একে 'ইলুমাইনটেড ওয়ান' বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এটা খুব দ্রুত আবার মঙ্গোলরা ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু পরবর্তীকালে আবার একটি নতুন সৃষ্টি হয়।


বর্তমানে, একবিংশ শতকে হাশাশিনরা বিখ্যাত হয়েছে একটি কাল্পনিক কম্পিউটার গেমের চরিত্র হিসেবে এবং এই নিয়ে 'এসাসিন্স ক্রিড' নামক একটি চলচ্চিত্র বেরিয়েছে। যদিও আরো গভীরে গেলে বোঝা যায় এই সংস্থাটি সত্তিকারের পুরোপুরি পৃথিবীর বুক থেকে গায়েব হয়ে যায়নি বরঞ্চ উনিশ শতক অবধি এই অ্যাসাসিনরূপে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে এবং হয়তো বর্তমানে কোনো শক্তিশালী সংস্থা হিসাবে। 300 বছর আগে সেই বিখ্যাত শেষ বংশধর এর মৃত্যুর পর আঠারোশো শতকে রহস্যময় বিভিন্ন হত্যা দেখা যেতে থাকে, যা সন্দেহ করা হয় কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দ্বারা হয়েছে এবং নিজরা ইসমাইলি সম্প্রদায়ের সাথে তাদের কোন যোগ রয়েছে। পরবর্তীকালে 1818 সালে নিজরা ইসমাইলি সম্প্রদায়ের নেতাকে ইরানের শাহ দ্বারা 'আগা খান' নামকরণ করা হয় যার অর্থ 'আধ্যাত্বিক গুরু' কিন্তু 1840 সালে এই সম্প্রদায়কে শাহকে হত্যার প্রচেষ্টায় দোষী সাব্যস্ত করা হলে আগা খান এশিয়া উপমহাদেশে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে চলে আসেন। এরপরেও সম্প্রদায়টি পরিচালিত হতে থাকে এবং অনুগামী সংখ্যা প্রায় 12 থেকে 15 মিলিয়ন বলে ধারণা করা হয়। তাদের বর্তমান নেতা হাভার্ডে পড়া 'চতুর্থ আগা খান' যিনি 1936 সালে জন্মগ্রহণ করেন। 

এরপর বিংশ শতাব্দীতে এই ইসমাইলি সম্প্রদায় খুব কঠোর প্রচেষ্টা করেন তাদের সম্প্রদায়কে নতুন রূপ দিতে এবং তাদের পুরাতন অ্যাসাসিন অতীত থেকে দূরে নিয়ে যেতে। 1933 সালে ইমাম সুলতান মুহাম্মদ শাহ এর নির্দেশনায় তৃতীয় আগা খান প্রথম বিভিন্ন সাহসিক প্রচেষ্টা করেন এই সম্প্রদায়ের ইতিহাসকে হাশাশিন অর্ডারের থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো, যেমন - আর্টস, ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের সাথে যুক্ত করার এবং 1967 সালে 'আগা খান ফাউন্ডেশন' সৃষ্টি হয় যদিও তারা বিংশ-একবিংশ শতকে তাদের এই সদর্থক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, কিন্তু 'সিক্রেট সোসাইটি' বা গুপ্তসংঘ নিয়ে এবং হাসাসিন অর্ডার নিয়ে রহস্য, ক্রুসেডের হাশাশিনদের কার্যকলাপ এবং 11, 12 এবং 13 শতকে অন্যান্য গুপ্ত সংঘের সাথে তাদের সংযোগ নিয়ে রহস্য থেকে গিয়েছে।
যেমন - আমরা আগে বলেছিলাম, ক্রুসেড এর সময়কালীন হাশাশিনরা ক্রুসেডারদের পক্ষে এবং বিপক্ষে উভয় দিকেই লড়াই করেছিল, যখন যেটা তাদের এজেন্ডার সাথে মিলেছিল।


কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রুসেডার এবং অর্ডারের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি বা জোট হওয়ার দরুন ক্রুসেডাররা ইউরোপে অ্যাসাসিন সিস্টেম নিয়ে এসেছিল; যা পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সিক্রেট সোসাইটি মধ্যে ছড়িয়ে গেছিল কিছু সোসাইটি এর অনুসরণ করেছিল। এদের মধ্যে পরে দা টেম্পলার, দা ফ্রিম্যাসন, দা রসিক্রুসিয়ান, এমনকি 'ইলুমিনাতি'!

 যেখানে আসল ঐতিহাসিক 'বেভারিয়ান ইলুমিনাতি' 1785 সালে নির্মূল করে দেওয়া হয়, বিভিন্ন মতবাদ বলে, আধুনিক ইলুমিনাতি আসলে নতুন ছদ্মবেশে 'নাইট টেম্পলার ' পরিচালনা করে, যারা পুনরায় ভয়ানক স্যাটানিক কাল্ট হিসাবে একত্রিত হয়েছে এবং আজও বর্তমান। যদিও ইলুমিনাতির সাথে হাশাশিন অর্ডারের যোগাযোগের কোনরকম প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কেবলমাত্র নাইট টেম্পলারদের পরিচালন পদ্ধতির সাথে তাদের কিছুটা একই রকম মিল পাওয়া যায়। কিছু মানুষ বিতর্কিত মন্তব্য করেছে যে, 'আগা খান ফাউন্ডেশন' সেই সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে একটি যেগুলি গোপনে ইলুমিনাতির অংশ কিন্তু এটা বলা যায় হাজার বছর আগে 'হাশাশিন অর্ডার' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেমন মানুষ বিভিন্ন ভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, সেরকমই তাদের সাথে যুক্ত সংস্থা বা সম্প্রদায়ও পরিবর্তিত হতে পারে। কখনো কখনো সেই পরিবর্তন ভালো থেকে খারাপের দিকে কিন্তু কখনো কখনো যেমন, এক্ষেত্রে সম্ভবত পরিবর্তন হয়েছে খারাপ থেকে ভালোর দিকে। 

2000 সালের শেষের দিকে ইকোনমিক টাইমসে একটি খবর প্রকাশ করে যে, বিলিওনারি আগা খান মাস্যাফ এর মাউন্টেন 'সিটাডেল' সংরক্ষণ করার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এই স্থানটি হাশাশিন অর্ডারের 'ওল্ড ম্যান' এর বাসস্থান ছিল এবং এটিকে সিরিয়ার ইতিহাস সংরক্ষণ করার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আলেপ্পোর মাঝামাঝি তেরোশো শতাব্দীর দিকে প্রাচীন বাণিজ্যপথের ধারে এই স্থানটি পৃথিবীর প্রাচীনতম শহর গুলির মধ্যে একটি এবং বর্তমানে এটি একটি 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট'; আশ্চর্যজনকভাবে এই বিনিয়োগের মধ্যে সালাদিনের দুর্গ কেও সংরক্ষণ করা হয - এটি সেই মানুষের বাসস্থান ছিল যে একসময় ওল্ড ম্যান অফ দ্য মাউন্টেন এর পরিচিত শত্রু ছিল!

আপনার কি মনে হয়? 

Sunday, 9 August 2020

"Subject - C" প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রহস্যময় এক্সপেরিমেন্ট এবং তার ভয়াবহ ফলাফল --


ইন্টারনেটে অনেক রকম অদ্ভুত অদ্ভুত ধরনের গল্প এবং ঘটনা ছড়িয়ে আছে এগুলির মধ্যে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রহস্যময় ঘটনাগুলি, ও বর্তমানে রাশিয়া ও আমেরিকার শীতে যুদ্ধকালীন ঘটনা অনেকেরই আকর্ষণের কেন্দ্র। তবে আজ যে ঘটনাটি আপনাদের বলছি সেটি সত্যি গায়ে কাঁটা দেওয়া এবং প্রায় অবিশ্বাস্য। বলে রাখি আমার লেখাটির সূত্র কেবলমাত্র ইন্টারনেটের বিভিন্ন তথ্য থেকে সংগ্রহ করা এটির সততা এখনো প্রমাণিত হয়নি। যদিও বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন প্রচুর অদ্ভুত রকমের গবেষণা চলেছিল যার অনেক তথ্য এখনো সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়নি, কিছু গবেষণা এখনো মানুষকে ভাবায় , কিছু কালের আড়ালে হারিয়ে গেছে ....



আশা করি আপনারা  'প্রিডেটর' নামক বিখ্যাত চলচ্চিত্র সিরিজের কোন না কোন একটি দেখে থাকবেন । যেখানে দেখা গেছে বহির্জগৎ থেকে আসা এলিয়েন জাতীয় প্রাণী কিভাবে মানুষের শিকার করেছে। তবে এই ঘটনাটি  তার থেকে কম রোমাঞ্চকর নয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বজুড়ে এক রক্তাক্ত অধ্যায় চলছিল এবং একে ঘিরে অবশ্যই বিভিন্ন রহস্যময় ও ঐতিহাসিক ঘটনা জুড়ে আছে। এর মধ্যে একটি হলো বৈজ্ঞানিক - ডক্টর হাওয়ার্ড ব্রাউন যিনি তার মতই একটু উন্মাদ অন্য ধরনের বৈজ্ঞানিকদের দলের সাথে একটি 'টপ সিক্রেট' মিলিটারি গবেষণা বা এক্সপেরিমেন্টের সাথে যুক্ত ছিলেন। মনে করা হয়, এগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বায়োলজিক্যাল এবং রাসায়নিক অস্ত্র প্রোগ্রামের একটি অংশ ছিল কিন্তু এই ঘটনাটির ক্ষেত্রে বিষয়টা আরো জটিল ও রহস্যময় হয়ে যায় যখন একদিন ব্রাউন এবং তার সম্পূর্ণ টিম কোন চিহ্ন ছাড়া অদৃশ্য হয়ে যায়। এইখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই রহস্যময় ঘটনাটির সূত্রপাত হয় যা যুদ্ধশেষে কোথাও ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল।



অনেকদিন ধরে বৈজ্ঞানিকদের সাথে কোনরকম যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় ঘটনাটির তদন্ত করার জন্য আয়ারল্যান্ডের এই 'কুইনাইন এস টেস্টিং ল্যাব' এর উদ্দেশ্যে একটি খোঁজ এবং উদ্ধারকারী অপারেশন চালানো হলো। বৈজ্ঞানিক দলটি এখানে 1915 সাল থেকে ছিল। এই অপারেশনটি ব্যর্থ হল যখন উদ্ধারকারী দলের কেউ ফিরে এলোনা এবং কারোর খোঁজ পাওয়া গেল না। 

যেহেতু পুরো বৈজ্ঞানিক দল গায়েব হয়ে গিয়েছিল এবং উদ্ধারকারী দলটির খোঁজ পাওয়া যায়নি তাই ব্রিটিশ রয়াল আর্মি এইবার একটি পুনরুদ্ধার এবং খোঁজার জন্য অপারেশন লঞ্চ করে কিন্তু শোনা যায় এটিও ব্যর্থ হয়েছিল এবং এখানেও কয়েকজন গায়েব হয়ে গিয়েছিল কিন্তু শোনা যায় এই টিম মেম্বারদের একজন একটি অডিও টেপ ও জার্নাল পেয়েছিল যা ডক্টর ব্রাউন তৈরি করেছিলেন এবং সেখানে একটি ভয়ানক রকমের দানবিক প্রকৃতির প্রাণীর বর্ণনা পাওয়া গিয়েছিল যাকে 'সাবজেক্ট সি' বলে উল্লেখ করা হয়। মনে করা হয়, এই ভয়ানক পশুটি তাদের সবাইকে হত্যা করেছিল।



এই জার্নালের বেশিরভাগ অংশই অস্পষ্ট ছিল এবং আবহাওয়া এবং সময়ের সাথে সাথে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল কেবলমাত্র সাতটি এন্ট্রি কিছুটা পড়ার মতো খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। 

প্রথমটি 1917 সালের 12 অক্টোবর যাতে লেখক লিখেছিলেন, "এই রহস্যময় দানবটি আয়ারল্যান্ডের উড পাইন এর জঙ্গলের দিকে পালিয়ে গিয়েছে এবং আমরাএটিকে খুঁজে বের করার এবং শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। " তিনি লিখেছিলেন, 'তারা দুটো গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অভিযানে বেরোনোর পরিকল্পনা করছেন এবং তার গ্রুপটিটির দায়িত্বে জঙ্গলের দক্ষিণের দিকটি ছিল যেখানে তাদের সাথে কিছু সৈনিক এবং ডক্টর ইউরিক সিগলভ সঙ্গ দিয়েছিলেন।'



পরের এন্ট্রিটি  পরের দিনের যেখানে  লিখেছিল, "গতকালের এক্সপিডিশন যথেষ্ট ভাল কাটলো যদিও এটা আমাদের সেরকম কোন স্থানে নিয়ে যেতে পারেনি; আমাদের এই পুরো ছয় ঘন্টার খোঁজে আমরা এই দানব একটিও ঝলক পাইনি, যদিও এই দিনটি পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল না। জঙ্গলের একটি গাছে চারটে বিশাল আকৃতির আচরের দাগ পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলির প্রত্যেকটি থেকে এক ধরনের পদার্থ বেরিয়ে আসছিল, এটা কি কোন প্রকার কাদা জাতীয় বস্তু না কি সাইটোপ্লাজমের কোন এক প্রকারের ফর্ম হতে পারে? আমরা এগুলি ছুতে সাহস পাইনি; কিন্তু ডক্টর সিগলভ একটি বোতলে এর একটি স্যাম্পেল ভবিষ্যৎ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করেন। আমরা টিম আলফার থেকে কোন কিছু শুনতে পাইনি। সম্ভবত তারাও কিছু খুঁজে পায়নি।" তারা আরো অনেক এই ধরনের অদ্ভুত রকমের আচরের দাগ খুঁজে পেয়েছিল এবং তাদের একটি সৈনিক অস্বাভাবিক ভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। এরপর তারা যখন এগিয়ে যায় লেখক দাবি করেছিলেন যে, তারা কিছু সদ্য কেটে দেওয়া গাছের সম্মুখীন হয়েছিল যেগুলিতে এই ধরনের তরল বস্তু লেগেছিল এবং তার সাথে সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটির ক্ষতবিক্ষত ছিন্নভিন্ন দেহ টুকরো গুলি খুঁজে পেয়েছিল, যার চামড়া গুলো তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং সেগুলো এই রহস্যময় তরলে পূর্ণ ছিল। এর পরের দিন একে একে আরো কিছু লোক নিরুদ্দেশ ও নিহত হয়ে যেতে থাকে।



তিনি লিখেছিলেন, "আমরা আরো দুইজনকে হারিয়েছি, একজন সৈনিক ছিল যার নাম আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না এবং আমাদের এক স্পেশালিস্ট ডক্টর নেথান রেডলি; তার পিতা একজন সৈনিক ছিলেন যিনি অনেক বছর আগে 'কুইনাইন এস টেস্টিং প্রজেক্টে' সুপারভাইজার ছিলেন। কিছু দূরে মৃতদেহগুলো খুঁজে পাওয়া গেছিল এবং সৈনিকের দেহটি প্রায় অক্ষত ছিল কিন্তু তার গলা এবং কব্জি রেডলির নিজস্ব ছুরিটি দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। এর থেকে মনে করা হচ্ছিল যে 'সাবজেক্ট সি' যখন ডক্টর কে আক্রমণ করেছিল তার ঠিক পরেই তার পোশাক এবং চামড়া তুলে ফেলা হয়েছিল এবং আবার ঠিক আগের মত ক্ষত বিক্ষত স্থানগুলি সেই সাইটোপ্লাজমিক সাবস্টেন্স এ ভর্তি ছিল -- যাকে আমি নাম দিয়েছি 'বিস্ট ব্লাড'......"



"এখন কেবল মাত্র আমরা চারজন রয়ে গিয়েছি; সময়ের সাথে সাথে বাকি সৈনিকেরা হারিয়ে গিয়েছে। আমরা আরো একটি স্থানে গতকাল একই রকমভাবে দুটি সৈনিকের দেহ খুজে পেয়েছি। দেখে মনে হচ্ছে এদের এদেরই ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছে। তিন নম্বর জনের নাম হিচকক ছিল তাকে পাঁচটা টুকরোয় কাটা হয়েছে। তার পোশাক এবং চামড়া তুলে নেওয়া হয়েছে এবং তার গর্তগুলো এইভাবে 'বিস্ট ব্লাডে' পূর্ণ। আমার আন্দাজ হচ্ছে সৈনিকদের মধ্যে একজনকে কোনভাবে অপর জনকে হত্যা করার জন্য বাধ্য করা হয়েছিল এবং বাকি দুইজনকে মৃত্যু অবধি লড়াই এ চালিত করা হয়েছিল। এটা আমার কেবলমাত্র একটি অনুমান ছিল যদিও ডক্টর সিগলভ মনে করেন, আমি ঠিকই ধরেছি এই প্রাণীটি যাই হোক না কেন তাদেরকে এক এক করে স্বীকার করে বেড়াচ্ছিল এবং মাঝে মাঝে জঙ্গলের গাছের ও ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে দ্রুত গতিতে বিশালাকৃতির কালো ছায়া ঝলক দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এত সময় পরও বোঝা যাচ্ছিল না এই দানবটি আসলে কি ছিল।



অবশেষে লেখক  এর সম্পর্কে শেষ এন্ট্রিতে একটি ঝলক দিয়েছিলেন, "আমি ঠিক ছিলাম! আমি ঠিক ছিলাম! 'সাবজেক্ট সি' আজ আমায় বাকি থাকা বিটা টিমের সাথে ধরে নিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে আমার মাথায় একটি নিষ্ঠুর গলা শুনতে পাচ্ছিলাম যেটি বলছিল, "ডাক্তার কে খুন করো! ইউরিক কে প্রথমে মরতে হবে, তার কাছে আমার কিছু বাকি আছে।"
আমি এই জিনিসটির সাথে কোন ঝামেলায় জড়াতে চাইলাম না এবং তাই করলাম।"

 ডঃ ব্রাউন তার লেখায় অনুমান দিয়েছিলেন, "এই প্রাণীটি 3 মিটার লম্বা এবং চারটি লম্বা থাবা রয়েছে।" --  কালো ছায়াটিও অতিরঞ্জিত ছিলনা।

"আমি ডক্টরের খুলিতে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিলাম। আমার অনুমান ছিল এতেই দ্রুততম মৃত্যু ঘটবে, আমি ঠিকই ছিলাম; আমার মনে হয় না তিনি আর উঠতে পেরেছিলেন।
আমায় আদেশ দেয়া হয়েছিল, অন্য দুজনকে গুলি করতে; দু'জনকেই প্রথমে পেটে এবং তারপর পায়ে। এর ফলে আশ্চর্যজনকভাবে, আমার শেষ বুলেটটি ফায়ার করার পরই তারা জেগে উঠলো, 'সাবজেক্ট সি' তাদেরকে মৃত্যু পর্যন্ত লড়ে যেতে বলল এবং আমায় সেটা দেখতে বাধ্য করলো। আমি প্রাণভয়ে সেই কথা শুনলাম। এই লড়াইটি খুবই দ্রুত ছিল, তারা কেবলমাত্র তাদের বন্দুকগুলি বের করল এবং একে অপরকে গুলি করলো। মনে হচ্ছে শয়তানটি দেখে খুব মজা পেয়েছিল এবং আমাকে চলে যেতে দিয়েছিল। আমি আর আমার পরিবার, আমার বন্ধুদের দেখতে পাবো না। আমি এখানে আটকে আছি। আমাদের পায়ের এবং অন্যান্য চিহ্ন দেখে আমি ল্যান্ডিং জোনে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিলাম, কিন্তু আমি কিছুই পাইনি; সব প্লেন গুলি চলে গিয়েছিল। এখন কেবলমাত্র আমি আওয়াজ শুনি একটি পরিচিত নিষ্ঠুর আওয়াজ, যেটা আমায় বলে এগুলি আমার শেষ মুহূর্ত।"

 এইটুকুই পাওয়া গিয়েছিল এর মধ্যে কোথাও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়নি এই রহস্যময় সাবজেক্ট সি কি ছিল। জার্নালের শেষের লেখাগুলি দেখে মনে হয় এগুলো ডক্টরের প্রথম দিকের লেখা থেকে আলাদা, তিনি যেন অন্য মানুষে পরিণত হচ্ছেন অথবা তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি কেবলমাত্র একটি অলীক কাহিনী হিসেবে মনে করা হয়।কিন্তু কিছু সাইট এর মতে এই জার্নালটি আসলে সত্যিকারের ছিল এবং কেবলমাত্র এটি নয়, এর সাথে একটি ভাঙ্গা ক্যামেরা পাওয়া গেছিল, যার মধ্যে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত ফটো ছিল -- এগুলিতে প্রমাণ ছিল।  কিন্তু এগুলি যথেষ্ট নয় কেবলমাত্র এই কয়েকটা জিনিস দিয়ে কিছুই দাবি করা যায় না।  ডক্টর হাওয়ার্ড ব্রাউন আদপে একজন সত্তিকারের মানুষ ছিলেন নাকি নাকি এগুলি সবই জাল বা বানানো গল্প অথবা অলীক কিংবদন্তি কাল্পনিক কাহিনী কিছুই সঠিকভাবে বোঝা যায় না। যদিও এটা একটু অন্য রকমের কাহিনী ছিল। আপনার কি মনে হয়?