Saturday, 22 September 2018

ব্ল্যাক হোল রহস্য

আমাদের পৃথিবীটা যেই সৌরজগত এর মধ্যে অবস্থিত সেই সৌরজগত এর বাইরে যে মহাবিশ্ব আছে সেখানে খুবই রহস্যময় বিষয়বস্তু চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। আমরা কিন্তু সবাই সেই বিষয়গুলি নিয়ে খুব একটা জানতে চাই না। তবে যারা বিজ্ঞানের উপরে বিশ্বাস রাখে তাদের  এক অংশ কে দেখা যায় এসব অজানা নিয়ে আরো জানতে আগ্রহী কিন্তু, বাকীরা জীবনে কয়েকবার মাত্র আকাশের দিকে যখন সময় পায় তখন একটু তাকিয়ে মনে কল্পনা করে কি আছে এই আকাশে। কিছু তারা ও চাঁদ দেখতে পারলেই মহাকাশ সম্পর্কে জানার ইচ্ছা শেষ হয়ে যায় তাদের। আজকে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর নিয়ে অল্প কিছু আলোচনা করবো।



রহস্যময় মহাবিশ্বের অনেক রহস্যময় জিনিসের মধ্যে মানুষ আজ পর্যন্ত খুব অল্প কিছুই জানতে পেরেছে, ৯৯,৯৯% এখনও মানুষের অজানা। তাহলে একবার ভেবে দেখুন এই মহাবিশ্বের কি জানতে পেরেছে আজকের পৃথিবীর মানুষ। পৃথিবী থেকে ভাগ হয় সৃষ্ট সেই চাদে মানুষ আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর আগেই ঘুরে এসেছেন। চাদের থেকেও এই মহাবিশ্বের আরো একটি রহস্য হচ্ছে এই ব্ল্যাক হোল। পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই কৃষ্ণ গহ্বর সম্পর্কে এ পর্যন্ত জানতে পেরেছেন সামান্যই। তবে যতটা তথ্য উদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন তা যথার্থই অভাবনীয়, সাধারণ চিন্তার বাইরে।


পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার এর নাম দেন ব্ল্যাক হোল, কারন ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষ বল এতই বেশি যে এর আকর্ষন থেকে এমনকি আলোও(ফোটন) বের হয়ে আসতে পারে না। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন তার জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত দিয়ে ধারনা করেন ব্ল্যাক হোল থাকা সম্ভব। আর মাত্র ১৯৯৪ সালে এসে নভোচারিরা প্রমাণ করেন আসলেই ব্ল্যাক হোল আছে। এটি কোন সাইন্স ফিকশন নয়। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জস্কাইল্ড ১৯১৬ সালেই দেখান যেকোন তারকা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে পারে। সূর্যের ব্যাসার্ধ (৮৬৪,৯৫০মাইল) যদি কমতে কমতে সঙ্কুচিত হয়ে ১.৯ মাইলে পরিণত হয় তাহলে সূর্যও ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে।

সূর্যের চেয়ে কমপক্ষে দশগুণ বড় নক্ষত্রদের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে এরা সঙ্কুচিত হতে হতে অতি খুদ্র অন্ধকার বিন্দুতে পরিণত হয়। এধরণের ব্ল্যাক হোলকে বলা হয় স্টেলার মাস (Stellar Mass) ব্ল্যাক হোল। বেশীরভাগ ব্ল্যাক হোলই এধরণের। কিন্তু নক্ষত্রের সঙ্কুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হওয়ার পরও ব্ল্যাক হোলে নক্ষত্রের সমান ভর ও অভিকর্ষ টান থাকে। আমাদের গ্যালাক্সিতে সম্ভবত ১০০ মিলিয়ন ব্ল্যাক হোল রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে প্রতি সেকেন্ডে একটি ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হয়। আরেক ধরণের ব্ল্যাক হোল হল সুপার মেসিভ (Super massive) ব্ল্যাক হোল। তাদের এক মিলিয়ন তারার ভর এমনকি এক বিলিয়ন তারার ভরও থাকতে পারে। সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোলরা কোন গ্যালাক্সির মিলিয়ন বা বিলিয়ন তারাকে একত্রে ধরে রাখে। আমাদের গ্যালাক্সিতেও কিন্তু একটি সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোল আছে। সেটির নাম Sagittarius A, যা আবিষ্কৃত হয়েছিল ৪০ বছর আগে।

ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ এতই বেশী যে এর থেকে দৃশ্যমান আলো, এক্স রে, অবলোহিত রশ্মি কিছুই রক্ষা পায় না। এজন্যই ব্ল্যাক হোল আমাদের কাছে অদৃশ্য। বিজ্ঞানীরা তাই ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণা করার সময় খেয়াল করেন ব্ল্যাক হোল তার আশপাশকে কিভাবে প্রভাবিত করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্ল্যাক হোল থেকে প্রায়ই উজ্জ্বল গ্যাস ও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফোয়ারা নিক্ষিপ্ত হয়।

আলট্রা ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলরা বিলিয়ন বছর আগে তৈরি হয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে ভর অর্জন করে এত বৃহৎ ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়েছে। বড় ব্ল্যাক হোলরা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে এটিই একমাত্র রহস্য নয়! এই ব্ল্যাক হোলরা কিভাবে সহস্র বিলিয়ন তারা ধরে রাখে তাও বিশাল রহস্য। সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলরা আগে সৃষ্টি হয়েছে নাকি গ্যালাক্সির গুচ্ছ বা ক্লাস্টার আগে সৃষ্টি হয়েছে তা আজও অজানা।

একটি আবিস্কার ব্ল্যাক হোল নিয়ে রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। বৈজ্ঞানিক Jonelle Walsh ও তাঁর সহকর্মীরা হাবল টেলিস্কোপের সাহায্যে NGC 1277 নামের একটি গ্যালাক্সি আবিস্কার করেছেন। গ্যালাক্সিটি ২০০ আলোক বছরের চেয়েও অধিক দূরে অবস্থিত। NGC 1277 এর আকার আমাদের মিল্কিওয়ের চার ভাগের এক ভাগ। কিন্তু Jonelle Walsh ও তাঁর সহকর্মীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল আছে যার আকার এই পর্যন্ত যত বড় ব্ল্যাক হোল আবিস্কার হয়েছে তার একটি। ধারণা মতে এটি Sagittarius A এর তুলনায় ৪০০০ গুণ বড়! Jonelle Walsh এর ভাষায় ‘ব্ল্যাক হোলটি তার গ্যালাক্সির তুলনায় অনেক বড়”

আগে ধারণা করা হত ব্ল্যাক হোল ও গ্যালাক্সি এক সাথে বড় হয় এবং এক সাথেই বড় হওয়া থেমে যায়। কিন্তু এই নতুন আবিস্কার অনুযায়ী হয় ব্ল্যাক হোল তার আশেপাশের তারা ও ব্ল্যাক হোল খেয়ে বড়  হতে থাকে অথবা শুরু থেকেই এটি কোন উপায়ে বেশী বড় হয়ে গিয়েছে।

এরকম আরো কি আশ্চর্য হবার মতো ঘটনা আছে এই ব্ল্যাক হোল এর ভেতরে যা আমাদের এই পৃথিবীতে কখনই ঘটে না। আলোর ব্যাপারটি দেখুন। যেহেতু এই ব্লাক হোল থেকে আলো পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারে না তাহলে ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ত কিভাবে দেখা যায় বা বুঝা যায় এরকম প্রশ্ন উঠতে পারে। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময়েই মহাকাশে প্রচুর তারকারাশি দেখা যায় যারা একটি বিশেষ বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে অথবা সর্পিলাকার গ্যাসীয় বস্তু দেখা যায় যা কোন বিন্দুকে কেন্দ্র করে অবস্থান করছে। এই বিশেষ বিন্দুগুলোই হল ব্ল্যাক হোল যেগুলোকে দেখা যাচ্ছে না ঠিকই কিন্তু তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে তারকারাশি বা গ্যাসীয় বস্তুগুলোর অবস্থান আর তাদের গতি-প্রকৃতির মাধ্যমে। বর্তমানে কিছু উন্নত প্রযুক্তি ব্যাবহার করে কিছু টেলিস্কোপ দিয়ে নেগেটিভের মতো কিছু ছবিও তুলে দেখাতে সক্ষম হয়েছে সৌরবিজ্ঞানীরা।

একসময় আশংকা করা হত, সূর্য কি তবে একদিন নিজেই ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে –পৃথিবীকে গ্রাস করবে? নাসার বিজ্ঞানিরা এ আশংকা উড়িয়ে দিয়েছেন।

 আমাদের গ্যালাক্সির নাম মিল্কি ওয়ে বা আকাশ গঙ্গা। আকাশ গঙ্গার ঠিক মাঝখানে রয়েছে সূর্য থেকে ৪ মিলিয়ন বেশি ভরের একটি ব্ল্যাক হোল। ১৬ বছর ধরে আশে-পাশের তারামন্ডলীর গতি-বিধি পর্যবেক্ষণ করে গত ২০০৮ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা Sagittarius A-star নামের ব্ল্যাক হোলটি শনাক্ত করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই ব্ল্যাক হোলটি কোন কিছু গলাধঃকরণ করছে না। ব্ল্যাক হোল এর ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত ধারণাটি হচ্ছে ব্লাক হোল সব কিছু গ্রাস করে নেয়।

আলো শুষে নেয় বলে ব্ল্যাক হোল দেখা সম্ভব নয়। আলো শুষে নিতে পারে বলে হয়তো ব্ল্যাক হোল সব কিছু গলাধঃকরণ করতে পারে এই ধারণা সবারই হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ব্ল্যাক হোলেরও নিজস্ব ভর রয়েছে। অধিকাংশ গ্যালাক্সিই ব্ল্যাক হোলকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান থাকতে পারে। তাই বলে, ব্ল্যাক হোল গ্যালাক্সিতে থাকা নক্ষত্র, গ্রহসমূহ গিলে ফেলে না। তাই এটা বলা যায়, আকাশ গঙ্গার মাঝখানে বৃহৎ ব্ল্যাক হোল যদি থেকেও থাকে, তা আমাদের পৃথিবীকে কখনোই গিলে ফেলবে না। বরং সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহগুলোর সাথে সমান দূরত্ব রেখে ঘূর্ণায়মান থাকবে। আবার ব্ল্যাক হোল সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় বৃহদায়তনের ভর সূর্যের নেই বলে সূর্যও কখনো ব্ল্যাক হোল এ পরিণত হবেনা।

এবার একটু ছোট্ট একটি চিন্তা করুন আমরা জানি যে আমাদের এই বিশাল পৃথিবী থেকে যেই ছোট্ট সূর্যটি আমরা দেখতে পায় তা আমাদের এই পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুন বড় একটি বস্তু। তার মানে এই সূর্যের কাছে আমাদের পৃথিবী কিছুই না। আবার যেই নক্ষত্র বা তারার কথা বলা হচ্ছে যাদের এই ব্ল্যাক হোল গিলে ফেলতে পারে সেই নক্ষত্রর একেকটার আকৃতি কিন্তু এই সুর্য থেকে কয়েক হাজার এমনকি কয়েক লক্ষ গুন বড় হতে পারে। তাহলে একটি ব্ল্যাক হোল বা (Super massive) ব্ল্যাক হোল এর ভেতরে আমাদের এই পৃথিবীর সমান কতটা পৃথিবী ধরতে পারে একটু চিন্তা করে দেখুন একবার। দরকার নেই থাক। আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এতোই বিশাল যে এর গ্রহ-উপগ্রহ, তারা, নক্ষত্র বিজ্ঞানীদের প্রায়ই ধাঁধায় ফেলে দেয়। আর এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ‘ইউওয়াই স্কুটি’ (UY Scuti) নামের সবচাইতে বড় তারা যেটা একাই বিজ্ঞানীদের মাথা গুলিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

Saturday, 15 September 2018

মহাকাশে যুদ্ধের হাওয়া - গোপন মিশনে রহস্যময় মহাকাশযান এক্স-৩৭বি!

কল অফ ডিউটি ঘোস্ট বা ইনফাইনাইট ওয়ার - বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি পাওয়া এই গেম গুলির গুরুত্ব পূর্ণ মিশনের মধ্যে দেখানো হয়েছিল মহাকাশে যুদ্ধ, মহাকাশকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী যা পৃথিবীর উপর এক বিপর্যয় নিয়ে আসে। সত্যি কি সেই দিন আস্তে চলেছে ? এই ভিডিও গেম গুলি কি কেবল কল্পনা থেকে যাবে না কি হয়ে উঠবে বাস্তব দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লেখকদের আরো একটি রচনা? বর্তমানের অনেক ভিডিও গেম (যেমন - এসাসিনস ক্রিড, ব্যাটেলফিল্ড ) বাস্তব পৃথিবী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরী হচ্ছে যা পরে জনপ্রিয় হচ্ছে। যাক সে কথা পরে হবে,
আজ যে বিষয় নিয়ে বলছি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে মার্কিন বিমান বাহিনীর মানববিহীন এক্স-৩৭বি স্পেসপ্লেন।


আকারে ছোট হলেও, অনেকটা যেন নাসার পুরনো দিনের মহাকাশযান!

লম্বায় ৩০ ফুট বা ৯.১ মিটার (মানে, একটা আড়াই তলা বাড়িকে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল রাখলে তা যতটা জায়গা জুড়ে থাকে)। আর তার একটা ডানা থেকে অন্য ডানাটার দূরত্ব ১৫ ফুট।ওজন ৪ হাজার ৯শ' ৮৯ কেজি।

পাঠানো হয়, কিছু দিন মহাকাশে কাটিয়ে সে ফিরে আসে। তার পর আবার তাকে পাঠানো হয় মহাকাশে। কিন্তু কেন পাঠানো হয়? কেনই-বা তাকে বার বার চুপিচুপি পাঠানো হয় মহাকাশে?
মহাকাশ যাত্রায় কি ধরণের পে লোড বা মালামাল বহন করে বা পৃথিবীর কক্ষে দীর্ঘ অবস্থানকালে এটি ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় তা বরাবরই গোপন রাখে আমেরিকা।
প্রথমবারের মতো অবতরণ করে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে। অবতরণের সময় এর সৃষ্ট 'সনিক বুম' নামে পরিচিত প্রচণ্ড শব্দে অনেকেই চমকে ওঠেন।
প্রতিবারই ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যাণ্ডেনবার্গ বিমান ঘাঁটিতে এটি অবতরণ করেছে।
মার্কিন বিমান বাহিনী যেসব গোপন মিশন পরিচালনা করে এ মহাকাশ যানটি তারই অংশ ছিল। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগণ জানিয়েছে- এ মহাকাশযানটি ঝুঁকি কমানোর কাজ করছিল।

এ প্রকল্পের জন্য কত ডলার খরচ করা হয়েছে, সে বিষয়টিও গোপন রাখা হয়েছে। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো এ বিশেষ মহাকাশযানটি উড্ডয়ন করা হয়েছিল।

মার্কিন বিমান বাহিনীর মানববিহীন এক্স-৩৭বি স্পেসপ্লেনটি দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্পেস-এক্স উৎক্ষেপণ করবে। এর আগেও স্পেস-এক্স মহাকাশে পণ্যবাহী রকেট উৎক্ষেপণ করেছিল। পাশাপাশি ফ্যালকন রকেট পুনরুদ্ধারের চেষ্টায়ও প্রতিষ্ঠানটি সফলতার পরিচয় দেয়।

বিমান বাহিনীর সেক্রেটারি হেথার উইলসন সিনেট আর্মড সার্ভিস কমিটির শুনানিতে এ ঘোষণা দেন।

বিমান বাহিনীর দুইটি এক্স-৩৭বি স্পেসপ্লেন আছে। তবে কোনটি উৎক্ষেপণ করা হবে তা  জানানো হয় না।

এক্স-৩৭বি মহাকাশ যানটি অরবিটাল টেস্ট ভিকেল (ওটিভি) হিসেবেও পরিচিত। মার্কিন বিমানবাহিনী এক্স-৩৭বি উৎক্ষেপণের জন্য কেন স্পেস-এক্সকে বেছে নিয়েছে তা জানা যায়নি। স্পেস-এক্স এ পর্যন্ত চারটি রকেট উৎক্ষেপণ করেছে।

এটি পৃথিবী নামক গ্রহটির চারপাশে অন্তত হাজারবার ঘুরপাক খেয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের উপর দিয়ে উড়েছে বেশ ক’বার।

ক্রুবিহীন এই বিমানে কোন ককপিট-জানালা নেই। সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি হলো, যেখানে কোন মহাকাশযান সর্বোচ্চ ১৭ দিন অবস্থান করতে পারে কক্ষপথে, সেখানে  প্রথম মিশনের আওতায় (ওটিভি-১) ২২৫ দিন মহাশূন্যে অবস্থান করেছিল এক্স-৩৭বি। তখন এটি কলোরাডোয় অবস্থিত বিমান বাহিনীর একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।
এক্স-৩৭বি মূলত ছোট মনুষ্যবিহীন সেপসপ্লেন তৈরির জন্য নাসা’র একটি প্রজেক্টের ফলাফল। নাসা এই প্রজেক্ট ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্স প্রজেক্টস অ্যাজেন্সি’র (ডারপা) হাতে হস্তান্তর করে। কিন্তু বাজেট সমস্যার কারণে প্রজেক্টটি আমেরিকান বিমান বাহিনীর র‌্যাপিড ক্যাপাবিলিটিজ অফিসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে প্রজেক্টের তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীই নিয়োজিত আছে। বিশ্বখ্যাত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং-এর ফ্যান্টম ওয়ার্কস বিভাগ এক্স-৩৭বি মডেলের দুইটি বিমান তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনী বলছে না, এক্স-৩৭বি মহাকাশে মূলত কী ধরনের অভিযানে নিয়োজিত। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনী প্রযুক্তিগত অর্জন হিসেবে মহাকাশ সমপর্কিত বিভিন্ন যান সমপর্কে কথা বলতে দ্বিধা বোধ করে না। কিন্তু এই মিশনের বেলায় তারা একেবারেই চুপ! ফলে গুজবের ডালপালা গজাচ্ছে।

সামরিক বাহাদুরিতে শুধু স্থল, জল আর আকাশপথেই থেমে নেই যুক্তরাষ্ট্র। 

সম্প্রতি পাওয়া তথ্যে তারা গড়তে যাচ্ছে 'মহাকাশ বাহিনী'। সেনাবাহিনীর ষষ্ঠ শাখা হিসেবে মহাকাশেও মোতায়েন থাকবে দেশটির সেনা। আগামী দুই বছরের মধ্যে এই বাহিনী মোতায়েন করা হবে। বাহিনী গঠনের জন্য এরই মধ্যে ভোট দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাউস আর্মড সার্ভিস কমিটির সদস্যরা। খবর ইনডিপেন্ডেন্টের। যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর ষষ্ঠ শাখা হিসেবে মহাকাশ সেনা পৃথিবীর আবহমণ্ডলের বাইরে অর্থাৎ মহাশূন্যে সামরিক তৎপরতায় নিয়োজিত থাকবে। প্রয়োজনে যুদ্ধও করবে এ বাহিনী। পেন্টাগন ও মার্কিন প্রতিরক্ষাদপ্তরকে ইতিমধ্যেই এই ‘স্পেস ফোর্স’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। এই সেনাবাহিনী হবে মার্কিন নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, মেরিন, সেনাবাহিনী এবং উপকূলরক্ষীর সমকক্ষ, কিন্তু আলাদা। এটি হবে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর ষষ্ঠ শাখা। ১৯৪৭, মার্কিন বিমানবাহিনীর একাত্তর বছর পর মার্কিন সেনাবাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে কোনও নতুন শাখা।বিমানবাহিনীর বৈপ্লবিক সংস্কারের অংশ হিসেবে এ বাহিনী তৈরি হচ্ছে। আগামী দু'বছরের কম সময়ের মধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য মহাকাশ বাহিনী গঠনের বিষয়টি এখনও পুরোপুরি অনুমোদন পায়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে এ বাহিনী অনুমোদন লাভ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কমান্ডের ছাতার তলে চলে আসবে বিমানবাহিনীর আওতাধীন সব মহাকাশ মিশন। মহাকাশ কমান্ডের একজন নতুন প্রধানও থাকবেন। আর এর মাধ্যমে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফে যোগ হবে ১৮তম সদস্য।

ট্রাম্পের টুইট: ‘মহাকাশবাহিনী গঠনের কাজ এগিয়ে চলেছে সব দিক থেকে!’

‘আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখার সময় চলে এসেছে, প্রস্তুত হতে হবে পরবর্তী রণাঙ্গনের জন্য, যেখানে আমাদের জনগণ, আমাদের দেশের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের হুমকিকে বাধা দেওয়া এবং পরাস্ত করার জন্য ডাকা হবে আমেরিকার সেরা ও সাহসীদের।’ বলেছেন পেন্স। ‘মহাকাশে মার্কিন গর্বের উত্তরাধিকারকে পুনর্প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। মহাকাশ, তাঁর কথায়, একটি রণাঙ্গন, ঠিক যেমন আকাশ, মাটি, জল।’

আশঙ্কা বাস্তব হলে কোলেটারাল ড্যামেজ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতি হবে অবর্ণনীয়। মহাকাশে অস্থিরতা মানে বিপন্ন হবে এই বসুন্ধরার অস্তিত্ব।

নিজস্ব উগ্র জাতীয়তাবাদী মেজাজে তবু ট্রাম্প বলেছেন: ‘মহাকাশে আমেরিকার নিছক উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়, মহাকাশে থাকা উচিত মার্কিন আধিপত্য।’

‘গত প্রজন্মে মহাকাশের পরিবেশের মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে: একসময় যা ছিল শান্তিপূর্ণ, যেখানে ছিল না কোনও প্রতিযোগিতা, এখন তা ভিড়েঠাসা, তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।’ পেন্সের দাবি, চীন ও রাশিয়া মহাকাশকে তাদের লড়াইয়ের খাসতালুকে পরিণত করেছে, চোখ রাঙাচ্ছে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চ্যালেঞ্জের মুখে কুঁকড়ে যাবে না।’

জুনে ট্রাম্প প্রকাশ্যে  স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির সঙ্গে মহাকাশে সেনা গঠনের রয়েছে সরাসরি যোগ।

আটের দশকের গোড়ায় রেগান বলেছিলেন ‘স্টার ওয়ার্স’, বা মহাকাশ যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা। যদিও সেই প্রস্তাব ছিল শুধুই একটি পরিকল্পনা, যা কখনও তেমনভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু বর্তমানে  মহাকাশবাহিনী গঠনের জন্য রয়েছে অর্থ সংস্থানের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা। তবে রেগান থেকে ট্রাম্প— এই সময়ে আমেরিকা মহাকাশে স্থাপন করেছে সামরিক উপগ্রহ। একই পথে হেঁটেছে রাশিয়া, চীন। এই মুহূর্তে মহাকাশে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ৮৫৯টি উপগ্রহ। এর মধ্যে ১৫৯টি ‘সামরিক’ উপগ্রহ, যেগুলি সরাসরি অপারেট করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যেখানে চীন, রাশিয়ার রয়েছে যথাক্রমে ৭৫ ও ৩৬টি সামরিক উপগ্রহ।

মার্চে প্রথম, সান দিয়েগোতে মার্কিন সেনাবাহিনীর উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘মহাকাশ নিয়ে আমাদের কৌশল হলো: আকাশ, মাটি, জলের মতো মহাকাশও হবে আমাদের কাছে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। তাই সেখানে যুদ্ধ করার জন্য মহাকাশবাহিনী নামে আমাদেরও থাকবে একটি আলাদা বাহিনী।’ পরে মে মাসে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে দাঁড়িয়ে একই সওয়াল করেন।

যদিও, ট্রাম্পের প্রস্তাব তাঁর মন্ত্রীসভা এবং পেন্টাগনের কাছ থেকেই বিরোধিতার মুখে পড়ে। শুরুতে বিরোধিতা করলেও ম্যাটিসই এখন বলছেন, এটি একটি ভালো পরিকল্পনা। মহাকাশ ‘একটা যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হচ্ছে, আর আমাদের ওই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।’

তাছাড়া, এই ধারণার সমর্থক রয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের ভিতরে-বাইরে, যাঁরা বলছেন, মহাকাশ এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে নেই সামরিকবাহিনীর কোনও পৃথক শাখা।

‘মহাকাশ হলো এমন একটি জায়গা’ যেখানে পরিকাঠামোয় রয়েছে ‘শয়ে শয়ে কোটি ডলার।’ বলেছেন মার্ক অ্যালব্রেকট, যিনি ১৯৮৯-৯২ পর্যন্ত ছিলেন ন্যাশনাল স্পেস কাউন্সিলের সচিব। ‘আর্থিক লেনদেন থেকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জি পি এস), যা আমাদের গাড়ির পথ নির্দেশ করে— হয় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মহাকাশ থেকে, নতুবা মহাকাশ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে।’ মহাকাশে সামরিক কার্যকলাপ, তাঁর মতে, সেকারণেই ‘মার্কিন নৌবাহিনী— যারা সমস্যা তৈরি বা যুদ্ধ এড়ানোর জন্য প্রশান্ত মহাসাগর, অতলান্তিক এবং ভূমধ্যসাগরে ঘুরে বেড়ায়— তাদের থেকে শুধু বস্তুগতভাবেই পৃথক নয়— যে সমস্ত জিনিস আজ আমরা উপভোগ করছি, তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও এটা আমাদের প্রয়োজন।’

মার্কিন সামরিকবাহিনী মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল মহাকাশের উপর। যোগাযোগ, পর্যবেক্ষণ এবং ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রকে চিহ্নিত করার জন্য এখন পেন্টাগনের কাছে মহাকাশই ভরসা। চীন ইতিমধ্যেই উপগ্রহকে ব্যবহার করে ভূপৃষ্ঠ থেকে আকাশে আঘাত হানতে সক্ষম এমন একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছে। যা নিয়ে ওয়াশিংটন খুবই উদ্বিগ্ন। ২০০৭, চীন এমনকি স্রেফ পরীক্ষা করার জন্য নিজেরই একটি আবহাওয়া-উপগ্রহকে গুলি করে নামিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যার প্রতিবাদ করেছে। অবশ্য পরের বছরই এস এম-৩ ক্ষেপণাস্ত্রকে ব্যবহার করে একটি উপগ্রহকে উড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

এটা কি আদৌ নতুন কোনও প্রস্তাব? মোটেই না। মহাকাশে সামরিকীকরণের এই ধারণা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন না।

সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পর থেকেই, যখন মার্কিন সরকার জার্মানি থেকে নিয়ে এসেছিল প্রাক্তন নাৎসি রকেট বিজ্ঞানীদের। ‘মার্কিন মহাকাশ ও সমরাস্ত্র কর্মসূচিকে সাহায্য করতে তাঁদের কারিগরি কৃৎকৌশল’ ব্যবহারের জন্যই নিয়ে আসা হয়েছিল তাঁদের। লিখেছেন নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জ্যাক মান্নো, তাঁর ‘আর্মিং দ্য হিভেনস: দ্য হিডেন মিলিটারি অ্যাজেন্ডা ফর স্পেস, ১৯৪৫-১৯৯৫’ গ্রন্থে। প্রায় ১,০০০ বিজ্ঞানীকে সেদিন নিয়ে আসা হয়েছিল, ‘যাঁদের অনেকেই পরে মার্কিন সামরিকবাহিনী, নাসা এবং অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন।’ যাঁর মধ্যে ছিলেন ‘ওয়ের্নহার ভ্যন ব্রাউন ও তাঁর সহকর্মীরা’, যাঁরা ‘শুরু করেছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য রকেট তৈরির কাজ।’

রহস্যজনক এক্স-৩৭বি মহাকাশ-বিমানের মতো মহাকাশে সামরিক প্রযুক্তি দেখভালের জন্য রয়েছেন ৩৬,০০০ কর্মী।  তাছাড়া, এখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে এক ধরনের মহাকাশবাহিনী: এয়ার ফোর্স স্পেস কমান্ড। এবং মার্কিন বিমানবাহিনী তার মহাকাশ অভিযানের জন্য প্রতি বছর খরচ করে ৮৫০ কোটি ডলার। এটাই যথেষ্ট নয়। আলাদা মহাকাশবাহিনী না থাকার কারণে পেন্টাগন প্রতি বছর খরচ করতে পারছে না ১২,৫০০ কোটি ডলার।

১৯৫৭, স্পুটনিক-১। বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ওড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। একবছর বাদেই, বহির্জগতের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য গঠিত হয় রাষ্ট্রসঙ্ঘের কমিটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, গণসাধারণতন্ত্রী চীন ছিল তার অংশ। ১৯৬৬, রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়ার পরের বছর ১৯৬৭-তে কার্যকর হয় আউটার স্পেস ট্রিটি। তিনটি দেশই সই করে সেই চুক্তিতে। অনুমোদন করে ১২৩টি দেশ।

চুক্তির মূল কথা ছিল: অনুসন্ধান, আবিষ্কারের জন্য সমস্ত দেশের কাছে মুক্ত থাকবে মহাকাশ। এই মহাকাশের কোনও কিছুকেই কোনও একটি দেশের ভূখণ্ড বলে দাবি করা যাবে না। মহাকাশের কার্যকলাপ হওয়া উচিত মানবতার কল্যাণের স্বার্থে। পারমাণবিক অস্ত্রসহ অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিষিদ্ধ থাকবে মহাকাশে। কোনও দেশই তা মজুত করতে পারবে না। নিজেদের মহাকাশ যানের ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী থাকবে সংশ্লিষ্ট সেই দেশ।

সাম্প্রতিক সময়ে, গত পঁচিশ বছর ধরে এই ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’র সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। শুধু পারমাণবিক অস্ত্র, গণবিধ্বংসী অস্ত্রই নয়, মহাকাশে থাকবে না কোনোরকম সমরাস্ত্র। মহাকাশ হবে সমরাস্ত্র-মুক্ত। বহির্জগতে সমস্ত সমরাস্ত্র নিষিদ্ধ করার জন্য এই সময়ে চীন, রাশিয়া রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে বারংবার খসড়া প্রস্তাব পেশ করে এসেছে। আর প্রতিবারই তা খারিজ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শেষে, গতবছর অক্টোবরে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সংশ্লিষ্ট কমিটি ‘বহির্জগতে অস্ত্র প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে বাস্তব পদক্ষেপ’ চেয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। বিরোধিতা করে মাত্র পাঁচটি দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ব্রিটেন, ইজরায়েল, ফ্রান্স এবং ইউক্রেন। ভোট দেয় প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। সমর্থন করে ১২১টি দেশ।

১৯৯৯ সালে এক্স-৩৭বি কর্মসূচি শুরু হয়,  মার্কিন এ গোপন মিশন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক কথা বলছেন তবে এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চীনের মহাকাশ গবেষণাগারের ওপর গোয়েন্দাগরি করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্স-৩৭কে নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা এবং গোয়েন্দা উপগ্রহ স্থাপনের কাজে লাগানো সম্ভব। এ সব কৃত্রিম উপগ্রহ অস্ত্র সজ্জিতও হতে পারে। অবশ্য পেন্টাগন দাবি করছে, অস্ত্রসহ কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনের কোনো পরিকল্পনায় এক্স-৩৭ ওটিভি জড়িত নয়।

এদিকে মহাকাশ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ মহাকাশ বিমানটি আমেরিকার সামরিক কর্মসূচীরই অংশ এবং মহাকাশ যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ। যুদ্ধকালীন সময়ে এ বিমানটি হয়ে উঠতে পারে মার্কিন সামরিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। এ বিমান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে সব ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র। বিমানটি লেসার অস্ত্র সজ্জিত করে প্রয়োজনের সময় শত্রুর উপগ্রহগুলো অকেজো করে দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। এটি শত্রুর আন্তমহাদেশীয় ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস বা অকেজো করে দেয়ার কাজেও ব্যবহার করা হতে পারে।

কারও ধারণা, কাকপক্ষী টের পাওয়ার আগেই এটা মহাকাশ থেকে আচমকা বোমা ফেলে দিতে পারে আমেরিকার কোনও শত্রু দেশ বা কোনও উপদ্রুত অঞ্চলের ওপর।
কারও অনুমান, ‘এক্স-৩৭বি’ আমেরিকার শত্রু দেশের উপগ্রহকে বধ করার হাতিয়ার। যা ‘শত্রু’ উপগ্রহকে পুরোপুরি ধ্বংস বা তার যথেষ্ট ক্ষতি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার গোত্র ‘কিলার স্যাটেলাইট’ বা ঘাতক উপগ্রহ। 
আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই কৃত্রিম উপগ্রহকে ব্যবহার করেছে, করে চলেছে প্রতিরক্ষায়, প্রতি আক্রমণের কাজে। সন্দেহ নেই, শত্রু দেশের উপগ্রহগুলিকে মহাকাশে বধ করার ফন্দিও আঁটা হয়েছে কখনও সখনও।

২০১৫ সালে সেই আশঙ্কাটা জোরালো হয়েছিল একটি রুশ উপগ্রহের সন্দেহজনক গতিবিধিতে। অনেকেরই ধারণা হয়েছিল, মহাকাশে শত্রু দেশের পাঠানো উপগ্রহগুলিকে বিকল করে বা ধ্বংস করে দিতেই ওই উপগ্রহটি পাঠিয়েছে রাশিয়া।

‘এক্স-৩৭বি’ চলে সৌরশক্তিতে। তার সৌর প্যানেল সূর্যের আলো, বিকিরণ শুষে নিয়ে যে জ্বালানি বানায়, সেটাই ‘এক্স-৩৭বি’-কে দৌড় করায় কক্ষপথে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি এক্স-৩৭বি শুধুই একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হয়ে থাকে, তাহলে পেন্টাগন কেন এ সমপর্কে তথ্য প্রকাশ করছে না। এ সমপর্কে উইডেন বললেন, আমি মনে করি না যে, আমেরিকান সরকার অসৎ কিছু গোপন করার লক্ষ্যে এক্স-৩৭বি নিয়ে গোপনীয়তা অবলম্বন করছে। বরং এর কারণ হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জড়তা।

বোয়িং বর্তমানে কেনেডি সেপস সেন্টারে অরবিটার প্রসেসিং সেন্টার রূপান্তরের কাজ করছে। বোয়িং এক্স-৩৭বি’র তুলনায় বড় এক্স-৩৭সি বানানোর প্রস্তাব করেছে। এক্স-৩৭সি ৬ জন মহাকাশযাত্রীকে নিয়ে কক্ষপথে যেতে ও ফিরতে পারবে। তবে এই প্রজেক্ট নির্ভর করবে রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার সমপর্কের উপর। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের পর রাশিয়াই মহাকাশে যাত্রী পাঠানোর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সক্ষম দেশ।

Saturday, 8 September 2018

বেনিংটন ট্রায়াঙ্গল - এক ভৌতিক অরণ্য

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নিয়ে পৃথিবীতে কম বিতর্ক তো হয় নি। সত্যিকার অর্থে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মাঝে আসলে কি আছে বলা মুশকিল। কিন্তু এমন স্থান পৃথিবীতে কেবলমাত্র একটি নয়।বেনিংটন ট্রায়াঙ্গল, ভারমন্ট, ইংল্যান্ড।বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কথা আমরা শুনে আসলেও এই বেনিংটন ট্রায়াঙ্গলের ঘটনা আরো বেশি ভয়াবহ যেখানে ভিন্ন গ্রহের যান, অদ্ভুত আলো, শব্দ, গন্ধ ও অদ্ভুত প্রাণী দেখা যাওয়ার ঘটনা তো আছেই। সেই সাথে আছে মানুষের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনাও।


এমন একটি বন যেখানে কেউ প্রবেশ করলেই রহস্যময়ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। অনেকে উন্মাদে পরিণত হয়, অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে বা শব্দ শুনতে শুরু করে। তাদের কোন চিহ্নই পাওয়া যায় নি,ঠিক যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছেন তারা। এই ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা, লেখা হয়েছে বই।
১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া এদুয়ার্দো স্যানচেজ ও ড্যানিয়েল মিরিক পরিচালিত আমেরিকান ভৌতিক মুভি The Blair Witch Projectর মূল কাহিনী এই ভয়াবহ স্থান ও সেটাকে ঘিরে ঘটে যাওয়া রহস্যময় ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে । কাহিনীটি একটি বনকে ঘিরে, যেখানে কেউ প্রবেশ করলেই রহস্যময়ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। অনেকে আবার উন্মাদে পরিণত হয়, অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে বা শব্দ শুনতে শুরু করে।

ভারমন্টের গ্রিন মাউন্টেনে টানা ৬ বছর (১৯৪৫-১৯৫১) যাবত এই রহস্যময় স্থানে কমপক্ষে ১০ জন ব্যক্তি রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে গিয়েছেন।  তাদের কোন চিহ্নই পাওয়া যায় নি, যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছেন তারা। এগুলোর জন্য কখনো রহস্যময় কোন প্রাণী, কখনো আলোর ঝলকানি ও কখনো আবার ভূতুড়ে ঘটনাকে দায়ী করা হয়। ভারমন্টে বহু বছর ধরে অনেক রহস্যময় ঘটনা ঘটে এসেছে, কিন্তু এই ১০ ব্যক্তির রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সবাইকে হতভম্ব করে দেয়। আর এসব নিয়ে প্রথম বই লিখেন জো সিত্রো প্যারানরমাল গল্প লেখক, নাম Green Mountain Ghosts, Ghouls, and Unsolved Mysteries ।

 জোসেফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই স্থানের নাম দেন ‘বেনিংটন ট্রায়াঙ্গল’।

১৮৯২ সালে এলাকাটির রহস্যময়তার প্রথম সূত্রপাত ঘটে বলে অনেকেই মনে করে থাকেন। এ সময় হেনরি ম্যাকডওয়েল নামের এক স্থানীয় মাতাল জিম ক্রাউলি নামের এক কারখানার শ্রমিককে হত্যা করে। বিচারে ম্যাকডওয়েলকে উন্মাদ ঘোষণা করা হয় এবং ওয়াটারবেরি অ্যাসাইলামে পাঠানো হয়, কিন্তু তার আগেই সে জেলখানা থেকে পালিয়ে যায়। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এর প্রায় ৩০ বছর পর একের পর এক রহস্যময় ঘটনা ঘটতে শুরু করে। ১৯২০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে বেনিংটন ট্রায়াঙ্গলে ঘটেছিল এমন কয়েকটি নিখোঁজের ঘটনা, যার রহস্যভেদ করা এখনো কোনো সার্চ টিম বা তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।


-- প্রথম যে ঘটনায় বেনিংটন ট্রায়াঙ্গল তোলপাড় হয়, তা আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা, ১৯৪৫ সালের ২ নভেম্বরের ঘটনা। ৭৫ বছর বয়সী মিডি রিভার্স নামের একজন গাইড ৪ জন শিকারীকে নিয়ে পাহাড়ে শিকারের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। দলটিকে নিয়ে ফিরে আসার সময় লং ট্রেইল রোড ও ৯ নম্বর রুটের কাছাকাছি এসে রিভার্স তার সহযাত্রীদের থেকে সামান্য এগিয়ে যান। এরপর থেকে তার সহযাত্রীরা তার আর কোনো হদিসই পাননি। হঠাৎই ওই জায়গা থেকে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পরে স্থানীয় পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকের দল চিরুনি অভিযান চালিয়েও রিভার্সের দেখা তো দূরে থাক, তার দেহ পর্যন্ত খুঁজে পায়নি।তার সহযাত্রীদের কাছে একটাই নিদর্শন ছিল, একটি বুলেট যেটা রিভার্সের কোমর থেকে পড়ে গিয়েছিল যখন তিনি জল খাচ্ছিলেন।

--পরের ঘটনাটি ঘটে প্রায় এক বছর পর। ১৯৪৬ সালের ১ ডিসেম্বর। বেনিংটন কলেজে অধ্যয়নরত পলা ওয়েল্ডেন নামের ১৮ বছরের যুবতী ভ্রমণের নেশায় লং ট্রেইলের উদ্দেশ্যে বেনিংটন ট্রায়াঙ্গলের বনের মধ্যে ঢুকে পড়েন। তার পরিচিত অনেকেই তাকে বনের মধ্য দিয়ে যেতে দেখেছে। কিন্তু সে আর জঙ্গল থেকে কখনো ফিরে আসেনি। ৫০০০ ডলারের পুরষ্কার ঘোষণা ও এফবিআই’র তদন্ত সত্ত্বেও পলাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।তাকে নিয়ে এমন গুজব ছড়ায় যে, পলা হয়তোবা তার প্রেমিকের সাথে কানাডায় চলে গেছে। আরেকটি ধারণাও তখন বেশ প্রচলিত ছিল, আর তা হচ্ছে প্রকৃতির মাঝে একাকী নিরিবিলি জীবনযাপনের জন্য নির্জন জঙ্গলকে বেছে নিয়েছে পলা। কিন্তু এর সপক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

--- তিন বছর পর।তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে, ১৯৪৯ সালের ১ ডিসেম্বর তারিখে। জেমস ই টেটফোর্ড নামের একজন প্রবীণ সামরিক ব্যক্তি তার এক আত্মীয়ের সাথে দেখা করার জন্য সেইন্ট এলবান থেকে বাসে করে বেনিংটনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। বাসে যাত্রী  ১৪ জন ছিলেন। কিন্তু বাস গন্তব্যস্থলে পৌঁছাবার পর দেখা গেল, জেমস বাসে নেই! বাসযাত্রীদের তথ্যমতে, বাসটি কোথাও যাত্রাবিরতি করেনি। কিন্তু সেইন্ট এলবান থেকে বাস যখন যাত্রা শুরু করে, তখন বাস ড্রাইভারসহ যাত্রীরা জেমসকে তার নির্ধারিত সিটে বসতে দেখেছে। বাস চলা শুরু করলে তিনি তার সিট থেকে একবারও ওঠেননি। আবার কয়েকজন যাত্রী শেষ স্টপেজের আগের স্টেশন পর্যন্ত জেমসকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছেন বলে জানান। বাসের চালক ও অন্য যাত্রীরা কেউই বলতে পারলেন না জেমস কোথায় হারিয়ে গিয়েছেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, জেমসের লাগেজ ব্যাগসহ তার টাকা ভর্তি ওয়ালেটটি তার আসনে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

--পরের ঘটনাটি ঘটে পল জেপসন নামের এক আট বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে। ১৯৫০ সালের ১২ অক্টোবর এক সকালের ঘটনা। ৮ বছর বয়সের পল জেপসন প্রায়ই পর্বতের কাছে ঘুরতে যেত।জেপসন ছিল তার মায়ের সাথে, তিনি এ সময় শুকরছানাদের খাবার খাওয়াচ্ছিলেন, আর জেপসন বাড়ির চারপাশে ছোটাছুটি করছিল। ঘণ্টাখানেক পর মা ঘরে এসে দেখেন, জেপসন ঘরের আশেপাশে কোথাও নেই। জেপসনের গায়ে ছিল লাল রঙের জ্যাকেট, দূর থেকেও যা সকলের চোখে পড়ার কথা।সে হারিয়ে যাবার পর পুলিশের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কুকুর তার গন্ধ শুঁকে কিছুদূর যাওয়ার পর তাকে আর খুঁজে পায় না। কিছুদূর গিয়ে যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।

--পঞ্চম ঘটনা জেপসনের ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহ পরে অক্টোবরের ২৮ তারিখ।৫৩ বছরের ফ্রিডা ল্যাঙ্গার ও তার ভাই হার্বার্ট এলসনার সমারসেট রিজার্ভেরারের কাছে ক্যাম্পিংয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। হঠাৎই একটি ছোট নদী পার হতে গিয়ে ফ্রিডা পানির মধ্যে পড়ে যান। তার পরনের কাপড়-চোপড় ভিজে যায় , এরপর তিনি হার্বার্টকে একটু অপেক্ষা করতে বলেন। পোশাক পরিবর্তনের জন্য ফ্রিডা ফিরে যান ক্যাম্পে। অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি আসছেন না দেখে, হার্বার্ট ক্যাম্পে ফিরে আসেন কিন্তু  ফ্রিডাকে খুঁজে পাননি। এলাকাটি ফ্রিডার কাছে বেশ পরিচিত, ফলে দিনের আলোয় হারিয়ে যাওয়া তার পক্ষে বেশ অসম্ভবই বটে। আবার শুরু হলো ব্যাপক তল্লাশি। দুই সপ্তাহ ধরে নভেম্বরের ৫-১২ তারিখ পর্যন্ত ৩০০ জন অনুসন্ধানকারীর সমন্বয়ে গঠিত ৫টি অনুসন্ধান টিম হেলিকপ্টার, এয়ারক্রাফট থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালিয়েও ফ্রিডার অস্তিত্ব কোথাও খুঁজে পায়নি।
তবে অদ্ভুত এক ব্যাপার হলো, এই ঘটনার এক বছর পর, ১৯৫১ সালের ১২ মে সমারসেট রিজার্ভের কাছাকাছি এক জায়গায় ফ্রিডার দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু তার দেহ ময়নাতদন্ত করেও মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে ফ্রিডাই একমাত্র মহিলা যার মৃতদেহটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

 কি আছে এই বেনিংটন ট্রায়াঙ্গলে?

ইউরোপীয়দের আমেরিকা আবিষ্কারের অনেক আগে থেকে এই জায়গাটি আদিবাসী আমেরিকানরা সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহার করতো। তাদের ধারণা ছিল এ জায়গাটি অভিশপ্ত হওয়ার কারণে এখানে খারাপ বাতাস প্রবাহিত হয়। এছাড়া এ-ও বলা হতো যে এই জায়গাতে খুব অদ্ভুত একটি পাথর আছে। সেই পাথরের উপর যার পা পড়তো, সেটা তাকেই খেয়ে ফেলতো। প্রাচীন কাল থেকেই থেকে অসংখ্য মানুষ হয় পাগল হয়ে গিয়েছে নয়তো মারা গিয়েছে কিংবা চরম দুর্ভোগে পতিত হয়েছে এই স্থানে প্রবেশ করে।এলাকাটিতে বসবাস স্থাপনকারী প্রথম ইউরোপীয় অধিবাসীদের এক অংশের অভিমত, পাহাড়ের পেছনের আকাশে প্রায় সময়ই এক অদ্ভুত আলোর ঝলকানি দেখা যায়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক মাদকতাময় গন্ধ আর মাঝে মাঝে শোনা যায় নানা অদ্ভুত ধ্বনি। স্থানীয় কারো কারো মতে, এক বিশাল দৈত্যাকার প্রাণীর বাস রয়েছে জঙ্গলটিতে। এই প্রাণীটির অকস্মাৎ আক্রমণের শিকার হয় অভিযাত্রীরা।

অনেক প্যারানরমাল বিশেষজ্ঞের মতে, স্থানটিতে বাস্তব চেনা ত্রিমাত্রিক জগতের প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে কেউ এই জগতে প্রবেশ করতে গেলে সে দিকভ্রান্ত হয়ে হারিয়ে যায়। আবার অনেকের মতে, ভিন্ন গ্রহের প্রাণীদের অবস্থান রয়েছে এই বেনিংটন টায়াঙ্গল জঙ্গলে, তাদের কারণেই ঘটছে এসব অস্বাভাবিকতা। আরেকটি মত হচ্ছে, কোনো সিরিয়াল খুনি বনের মধ্যে বসতি গড়ে আছে, সে-ই এই সব খুনের পেছনে দায়ী। বিষয়টি যদি সত্যি হয়, তাহলে একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়, এতগুলো হত্যাকাণ্ডের কোনো হদিস কেন পাওয়া গেল না। একটি ছাড়া কেন পাওয়া গেলো না আর কোনো মৃতদেহ।

এরপরও এমন কিছু তথ্য এসব অদৃশ্য ঘটনার পেছনে পাওয়া যায়, যেগুলো বেশ রোমাঞ্চকর।

- সবগুলো ঘটনা একটি বিশেষ সময়ে ঘটেছে। শীতের সময় ছাড়া বছরের অন্য সময়ে এমন কিছু ঘটে নি।

- ওয়েল্ডন ও ট্রেডফোর্ড তিন বছরের ব্যবধানে একই তারিখে অদৃশ্য হয়ে যান, যা বেশ কাকতালীয়।

-ফ্রিডা ছাড়া আর কারো কোনো হদিস শেষপর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু কীভাবে ফ্রিডা তার তাঁবু থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল, সেটিই একটি রহস্য।

- হারিয়ে যাওয়ার পর অনুসন্ধান দল তন্নতন্ন করে খুঁজেও ফ্রিডার কোনো হদিস পায়নি। অথচ এক বছর পর যে জায়গা থেকে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানেই তার লাশ পাওয়া যায়, যা এক বড় রহস্য।

১৯৩৭ সালের পূর্বে এলাকাটি বেশ জনবহুল ছিল। কিন্তু ১৯৩৭ সালের দিকে গ্লসটেনবারি শহরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারি দেখা দেয়, ফলে অনেক লোকের মৃত্যু ঘটে। সে সময় নগরটি পরিত্যক্ত হয়। ২০১০ সালের একটি আদশুমারীর তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকাটিতে সব মিলিয়ে মাত্র আটজন বাসিন্দা বাস করে। বর্তমানে এটি ভূতুড়ে শহর হিসেবে পরিচিত।


Tuesday, 14 August 2018

বাঙালীর অনুপ্রেরণা - বীর মাস্টারদা সূর্য সেন

ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে সঙ্গীদের  উদ্দেশে সূর্য সেন লিখে গেলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য রেখে গেলাম মাত্র একটি জিনিস, তা হলো আমার এটি সোনালি স্বপ্ন। স্বাধীনতার স্বপ্ন। প্রিয় কমরেডস, এগিয়ে চলো। সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত।’
ব্রিটিশরা তাঁর লাশ বস্তাবন্দী করে দূরসমুদ্রে ফেলে দিয়ে এল। বাংলার মাটিতে কোথাও যেন তাঁর চিহ্ন না থাকে। কিন্তু বিপ্লবী আত্মার যে মৃত্যু নেই। সূর্য সেন এ দেশের নির্যাতিত মানুষের হূদয়ে তাই আজও অমর।

মাস্টারদার পুরো নাম সূর্য কুমার সেন, ডাকনাম কালু। তবে মাস্টারদা নামে সহযোদ্ধাদের কাছে পরিচিত ছিলেন। মাস্টারদা ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রাজমনি সেন ও মাতার নাম শশী বালা সেন। মাস্টারদারা ছিলেন দুই ভাই ও চার বোন।সূর্য সেন তাঁদের পরিবারের চতুর্থ সন্তান ছিলেন।শৈশবে পিতা মাতাকে হারানোর পর সূর্য সেন কাকা গৌরমনি সেনের কাছে মানুষ হয়েছেন।


ছোট বেলা থেকেই পড়ালেখার প্রতি মনোযোগি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি স্বভাবের ছিলেন।বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বড়লাটকে মারার জন্য ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্লচাকী বোমা নিক্ষেপ করেন। বোমা নিক্ষেপের পর প্রফুল্লচাকী ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথায় রিভলবারের গুলি ছুড়ে আত্মহত্যা করেন। এর প্রায় তিন মাস দশ দিন পর ১১ আগস্ট ১৯০৮ ব্রিটিশ সরকার ক্ষুদিরামকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে।  এ ঘটনাও তাকে সেই শৈশবে প্রচন্ড ভাবে মর্মাহত করেছিল।

চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এফ. এ. পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে পাশ করে তিনি সেই কলেজেই বিএ-তে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু তৃতীয় বর্ষের কোন এক সাময়িক পরীক্ষায় ভুলক্রমে টেবিলে পাঠ্যবই রাখার কারণে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিতাড়িত হন।

১৯১৬ সালে বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় কলেজের অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সান্নিধ্য লাভ করে সরাসরি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হন মাস্টারদা।

এরপর ১৯১৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাশ করে চট্টগ্রামে ফিরে আচার্য্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষাকতা শুরু করার মাধ্যমেই মাস্টারদার কর্মজীবন শুরু। অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দেওয়ানবাজারের বিশিষ্ট উকিল অন্নদা চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত ‘উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে’ অংকের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময় বিল্পবী দলের সাথে যুক্ত হয়ে ওঠেন এবং শিক্ষকতা করার কারণে তিনি মাস্টারদা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন বিল্পবী সহযোদ্ধাদের কাছে।

 অধ্যাপক সতীশচন্দ্র তৎকালীন যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত ছিলেন বলে মাস্টারদাকে বিপ্লবী আদর্শে ও বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দেন। বিপ্লবী ভাব ধারায় দীক্ষিত সূর্য সেন দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকে একমাত্র তপস্যা হিসেবে নিয়ে ছিলেন। তাই তিনি বিবাহ-বিরোধী ছিলেন। কারণ মাস্টারদা মনে করতেন, বিবাহিত জীবন তাঁকে কর্তব্য ভ্রষ্ট করবে, আদর্শচ্যুত করবে। কিন্তু পারিবারিক ও আত্মীয় স্বজনের চাপে ১৯১৯ সালে বিয়ে করতে বাধ্য হন। যদিও বিবাহর তিন দিন পর মাস্টারদা বাড়ি থেকে পালিয়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন।
এরপর চট্টগ্রামে আগে থেকে গঠন করা দুই বিল্পবী দল যুগান্তর ও অনুশীলনে যোগ না দিয়ে মাস্টারদা ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে বিপ্লবী অনুরূপ সেন, চারুবিকাশ দত্ত, অম্বিকা চক্রবর্তী, নগেন্দ্রনাথ সেনদের সঙ্গে নিয়ে সতন্ত্রভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে গোপন বিপ্লবী দল গঠন করেন। এর মধ্যে বিপ্লবী চারুবিকাশ দত্ত তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে অনুশীলন দলের সাথে যুক্ত হয়ে যান। যদিও ১৯২০ সালে গান্ধীজী কর্তৃক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে অনেক বিপ্লবী এই আন্দোলনে যোগ দিলে কিছুদিন পর মাস্টারদাও যোগ দেন। গান্ধীজীর অনুরোধে এক বছর বিপ্লবী কাজ বন্ধ রাখার পর ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে বিপ্লবী দলগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

১৯২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর বর্তমান টাইগার পাস এলাকা থেকে মাস্টারদার গুপ্ত সমিতির সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতনের ১৭,০০০ টাকার বস্তা ছিনতাই করে নিয়ে যান। ছিনতাইয়ের দুই সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক বসলে পুলিশ টের পেয়ে বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দেয়। এসময় পুলিশের সাথে বিপ্লবীদের খন্ড যুদ্ধ হয়,  যা “নগরখানা পাহাড় যুদ্ধ” নামে পরিচিত। মাস্টারদা ও অম্বিকা চক্রবর্তীকে রেলওয়ে ডাকাতি মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। যদিও কিছুদিন পর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারে তাঁরা দুজন ছাড়া পেয়ে যায়। তৎকালীন সময় বিপ্লবী দলগুলোতে প্রথম দিকে মেয়েদের যোগ দেয়া নিষিদ্ধ ছিল বিভিন্ন কারণে। পরবর্তীতে প্রীতিলতা ও কল্পনাদত্তদের মধ্যে বিপ্লবীর আগুন দেখে মাস্টারদা মেয়েদের দলে যুক্ত না করার নির্দেশ শিথিল করেন। এরপর প্রীতিলতা ও কল্পনাদত্ত যোগ দেন।


এরপর ১৯২৬-এ টেগার্ট হত্যা প্রচেষ্টায় আবারও গ্রেফতার হয়ে মাস্টারদা  ১৯২৮ সালে ছাড়া পান। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯২৮ সালে কলকাতায় নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে চট্টগ্রাম থেকে মাস্টারদাসহ অন্যান্যরা যোগ দেন। তখন নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোসের সাথে মাস্টারদার বৈঠক হয়। এর পরের বছর ১৯২৯ সালে মহিমচন্দ্র ও মাস্টারদা চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৩০ সালে মাস্টারদা ও অম্বিকা চট্টগ্রাম আসকার খাঁর দিঘীর পশ্চিম পাড়ে কংগ্রেস অফিসে সশস্ত্র বিপ্লবের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করাকালীন আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের দলের নাম পরিবর্তন করে “ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চিটাগাং ব্রাঞ্চ”  করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ি কৌশলে একটি দলকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। মাস্টারদার দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৫ জন, অম্বিকার ১৫ জন, অনন্ত সিং ও গণেশ ঘোষের ২২ জন এবং নির্মল সেনের ৬ জন। চারটি দল অস্ত্র সংগ্রহ ও বোমা তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলো।

 ১৯৩০ সালের সেই ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গুড ফ্রাইডে থাকায় সেদিন ওই ক্লাবে কেউ ছিল না বলে মাস্টারদা ঠিকে করেন পরের মাসের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা ওয়েদ্দারের নেতৃত্বে হামলা করা হবে। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতার নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করা হয়। এই আক্রমণে ৫৩জন ইংরেজ হতাহত হয়। গুলিতে আহত প্রীতিলতা দৈহিকভাবে অত্যাচারিত হওয়ার চাইতে স্বেচ্চায়মৃত্যুকে বেচে নিয়ে পোটাশিয়াম সায়ানাইড নামক একটি কঠিন বিশ খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল শুক্রবার রাতে বিদ্রোহের দিন ঠিক করে চারটি দল চার বাড়ি থেকে বের হয়ে একদল ধুম রেল লাইনের ফিসপ্লেট খুলে দেয়। এতে একটি মালবহনকারী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে যায়। যার কারণে চট্টগ্রামের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই সুযোগে একদল  টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস দখল করে ভাংচুর করে, কেউ রেলওয়ে অস্ত্রগার দখল করে পেট্রোল ছড়িয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা জালাবাদ পাহাড়ে অবস্থান করলে ইংরেজ সৈন্যরা তাঁদের আক্রমণ করেন। টানা দুই ঘন্টা যুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্যদের ৭০ জন নিহত হয় এবং বিপ্লবীদের মধ্যে ১২ জন শহিদ হন। এঁরা হচ্ছেন, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেনগুপ্ত, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, হরিগোপাল বল, মতিলাল কানুনগো, প্রভাসচন্দ্র বল, শশাঙ্কশেখর দত্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাসগুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, পুলিনচন্দ্র ঘোষ, এবং অর্ধেন্দু দস্তিদার। জালাবাদ যুদ্ধেরপর মাস্টারদাকে গ্রেফতারের অনেক চেষ্টার পরও ব্যর্থ হয় ব্রিটিশ বাহিনী। কিন্তু বিপ্লবীদের মধ্যে কেউ কেউ ধরা পড়ে আবার কেউ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী দামপাড়া পুলিশ ব্যারাক দখল করে আক্রমণে অংশ নেওয়া বিল্পবীরা জাতীয় পতাকা উত্তলন করে। বিপ্লবীরা মিলিটারি কায়দায় কুচকাওয়াজ করে মাস্টারদা সূর্য সেনকে তাঁর আদর্শের সাথে সাহসি নেতৃত্বদানের জন্য সংবর্ধনা প্রদান করেন। ওই সময়ই মাস্টারদা অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন এবং পুরো চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসকদের হাত থেকে চারদিন মুক্ত রাখেন।

 কিন্তু এরমধ্যে বিপ্লবীদের খাদ্যসংকট দেখা দিল এবং সূর্য সেন সহ অন্যদের কচি আম, তেঁতুল পাতা, কাঁচা তরমুজ এবং তরমুজের খোসা খেয়ে কাটাতে হয়। সূর্য সেন সহ ছয়জন শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবীকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার ৫০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষনা করে।  জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে অংশ নিয়ে পলায়ন করতে সক্ষম হলেও পরবর্তীকালে পুলিসের আক্রমণে দুজন শহীদ হন, এঁরা হচ্ছেন অপূর্ব সেন এবং জীবন ঘোষাল।
জালালাবাদ যুদ্ধের পর বিপ্লবী নেতাদের ধরার জন্য রেলস্টেশন, স্টীমারঘাট হতে শুরু করে সব স্থানে অভিযান চলছিলো। বিপ্লবীরা তখন বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে আত্মগোপন করে ছিলো। সূর্য সেন ১৬ জন বিপ্লবীকে নিয়ে ২৪ এপ্রিল রাতে নিজের বাড়িতে আসেন। এর মধ্যে অনন্ত সিং পুলিশের কাছে স্বেচ্ছায় ধরা দেন এবং কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে এবং এদের বিরুদ্ধে অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলা শুরু হয়। এ মামলা শুরু হওয়ার পর অসুস্থ অম্বিকা চক্রবর্তী পটিয়া থানার চক্রশালা গ্রামে গ্রেপ্তার হন। অম্বিকা চক্রবর্তী এবং সেসময় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য বিপ্লবীদের নিয়ে দ্বিতীয় অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলা শুরু হয়। প্রায় ১৯ মাস বিচারের পর ১৯৩২ সালের ১লা মার্চ অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলার রায়ে অনন্ত সিং, লোকনাথ বল এবং গনেশ ঘোষসহ ১২ জনকে দ্বীপান্তর বাসের আদেশ দেয়া হয়।পরবর্তীতে অপর মামলায় অম্বিকা চক্রবর্তীর প্রাণদন্ডের আদেশ হয় পরে হাইকোর্টে আপিলের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়।  ১৯৩২ সালের ১৩ জুন রাত ৯টায় পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে সাবিত্রী চক্রবর্তীর বাড়িতে তাঁকে ধরার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামেরনকে গুলি করে সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন কিন্তু নির্মল সেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

 ১৯৩৩ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী রাতে সেখানে এক বৈঠকে ছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাসগুপ্ত। ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্র সেন সূর্য সেনের উপস্থিতির খবর পুলিশকে জানিয়ে দেয়।রাত প্রায় ১০টার দিকে পুলিশ আর সেনাবাহিনী ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। রাতের অন্ধকারে গুলি বিনিময় করে কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত আর সুশীল দাসগুপ্ত পালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু রাত ২টার দিকে অস্ত্রসহ সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেন ধরা পড়েন। তারপর ঐ বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ সূর্য সেনের নিজের হাতে লেখা অর্ধসমাপ্ত আত্মজীবনীর খাতা উদ্ধার করে। সেই খাতার উপর লেখা ছিল “বিজয়া”। বিচারের সময় “বিজয়াতে” লেখা তাঁর কথাগুলো বিপ্লব এবং প্রশাশনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমান হিসাবে অনেকবার ব্যবহার করা হয়। ১৭ই ফেব্রুয়ারী রাতে সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেনকে প্রথমে জেলা গোয়েন্দা সদর দপ্তরে, পরে কোর্ট হয়ে চট্টগ্রাম জেলে নেয়া হয়। সূর্য সেন গ্রেপ্তার হবার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল “চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন সম্পর্কে ফেরারী সূর্য সেনকে গত রাতে পটিয়া হইতে ৫ মাইল দূরে গৈরলা নামক স্থানে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে। সূর্য সেনকে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মামলায় প্রধান আসামি বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। গত ১৯৩০ সাল হইতে সূর্য সেন পলাতক ছিলেন এবং তাঁহাকে ধরাইয়া দিবার জন্য সরকার দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা করিয়াছিলেন”।

সূর্যসেন, তারকেস্বরে ও কল্পনা দত্তকে বিচার করার জন্য ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২১/১২১এ ধারা অনুযায়ী স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৯৩৩ সালের ১৪ই আগষ্ট এই রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনাল সূর্য সেনকে ১২১ ধারায় মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। ওই একই ধারায় তারকেস্বরেও মৃত্যুদন্ড পায়। অন্যদিকে কুমারী কল্পনা দত্তকে ১২১ ধারায় দোষী করে জাবজ্জীবন দন্ডাদেশ করে। মামলার রায় পদানের পর তিন জনের পক্ষে কলকাতা হাই কোর্ট আপিল করলেও ১৪ নভেম্বর হাইকোর্ট পদত্ত রায়ে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল দেয়া দন্ড বহাল রাখে।

এরপর সূর্যসেনকে চট্টগ্রাম কারাগারের কনডেমড সেলের নির্জন কুঠুরীতে রাখা হতো। একজন কয়েদি মেথর সূর্য সেনের লেখা চিঠি ময়লার ঝুড়িতে নিয়ে জেলের বিভিন্ন ওয়াডের্র বন্দী বিপ্লবীদের দিয়ে আসতো। মৃত্যুর আগে জেলে আটক বিপ্লবী কালীকিঙ্কর কাছে পেন্সিলে লেখা বার্তা পাঠান। সেই বার্তায় তিনি লেখেন, “আমার শেষ বাণী- অদর্শ ও একতা”। তাঁর ভাষায়, “ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যে সব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো।”
শেষ দিনগুলোতে জেলে থাকার সময় তাঁর একদিন গান শোনার খুব ইচ্ছা হল। সেই সময় জেলের অন্য এক সেলে ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। রাত ১১টা/১২টার দিকে কল্পনা দত্ত তাঁকে চিৎকার করে বলেন “এই বিনোদ, এই বিনোদ, দরজার কাছে আয়। মাষ্টারদা গান শুনতে চেয়েছেন”। বিনোদ বিহারী গান জানতেন না। তবুও সূর্য সেনের জন্য রবিঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গানটা গেয়ে শোনালেন।তার বিচারের সময় তার বিরুদ্ধে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলেও বিচারক তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন। ১৯৩৪ সালের ১২-ই জানুয়ারী চট্টগ্রাম জেলে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মম ভাবে হাতুড়ী পেটা করল প্রথমে । হাতুড়ীঘাতে মুখমণ্ডল থেঁতলে গেল তাদের , ভেঙ্গে গেল সবকটা দাঁত।  হাতের নখ উপড়ে তুলে ফেলা হল একের পর এক। হাঁটু থেকে শুরু করে সমগ্র শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে চলল নির্বিচারে আঘাতের পর আঘাত । শরীরের সকল হাড় ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। এক পর্যায়ে তারা নিস্তেজ হয়ে জ্ঞান হারালেন। তারপর মৃতপ্রায় শরীর দুটিকে টানতে টানতে , তাদের গলায় বেঁধে দেয়া হয় হল ফাঁসীর দড়ি । মৃত্যু নিশ্চিত করতে ফাঁসীর মঞ্চে ঝুলে পড়লেন সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদার।
লাশ দুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টিমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হল। তারপর তাদেরকে ব্রিটিশ জাহাজ  “The Renown” এ তুলে, তাদের বুকে বেঁধে দেয়া হল লোহার বড় বড় টুকরো। জাহাজ চলে আসল বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর সংলগ্ন কোন এক গভীর অভ্যন্তরে। অতল গভীর জলে নেমে গেলেন, সূর্যসেন ও তারেকশ্বর দস্তিদার।

 বাঙালীকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি। কারণ বাঙালী সূর্যসেন, প্রীতিলতা ও তিতুমীরের উত্তরসূরী। আজো আমাদের লড়াই করতে হচ্ছে বাক স্বাধীনতার জন্য, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য, গণতান্ত্রিক ও শোষণ বৈষম্যহীন সমাজের জন্য। মানবিক পৃথিবী বিনির্মানের লড়াইয়ে মাস্টারদা আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

Sunday, 12 August 2018

আপনার শরীরের জন্য ভিটামিন-ই কেন দরকার --

শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি ভিটামিন হলো ভিটামিন-ই। এটি শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ও সুস্থ থাকতে ভূমিকা রাখে।

ভিটামিন - ই'র উপকারিতা--

-- কোষ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচতে শরীরে চাই অ্যান্টঅক্সিডেন্ট উপাদান, যা ভিটামিন-ই থেকে পাওয়া যায়। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষের জন্য ক্ষতিকারক মৌলগুলির সঙ্গে লড়াই করে। দূষণ এবং ধূপমান থেকে শরীরে মুক্তমৌল তৈরি হয়। ভিটামিন ই- তে এমন এক ধরণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা কোষ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। সাধারণত দূষণ এবং ধূমপান থেকে শরীরে যে ক্ষতিকারক মুক্তমৌল তৈরি হয় তার বিরুদ্ধে এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুদ্ধ করে। এতে আমরা সুস্থ থাকতে পারি। 

-- বাজারে ভিটামিন-ই যুক্ত তেল পাওয়া যায়। ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, এর নানা উপকারিতা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হল কাটাছেড়ার ক্ষত ও ব্রণ সারানো।

-- কোষ পুণর্গঠন প্রক্রিয়ার জন্য ভিটামিন-ই উপকারী হওয়ায় এটি ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে সক্ষম।

-- চুলের সুস্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন-ই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চুপ পড়া, অল্প বয়সে চুল সাদা বা ধুসর হওয়া থেকে বাঁচতে চাই ভিটামিন-ই।

-- স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন-ই’তে ভরপুর খাবার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ‘ইমিউন সেল’ বা রোগ প্রতিরোধকারী কোষ তৈরি সহায়ক, যা শরীরে তৈরি করে ব্যাকটেরিয়া-নাষক অ্যান্টিবডি।

--- গবেষণায় দেখা গেছে ভিটামিন-ই গ্রহণ করলে হূদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, চোখের ছানি, মাংসপেশির ব্যথা, ঠাণ্ডা লাগা ও আন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়।

---  হার্ট অ্যাটাক কমাতে ভিটামিন-ই মধ্যবয়সী পুরুষ এবং মহিলা যারা ভিটামিন-ই গ্রহণ করে থাকেন, যেসব লোক গ্রহণ করেন না, তাদের চেয়ে হার্ট এ্যাটাক কম হয়। তথ্যটি জানা গেছে হার্ভার্ড স্কুলের পাবলিক হেলথ বিভাগের দ’টি পৃথক গবেষণা থেকে। দি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে প্রায় ৪০ হাজার পুরুষ যারা কমপক্ষে দুই বছর দৈনিক ন্যূনতম ১০০ I.U ভিটামিন-ই গ্রহণ করেছেন তাদের হার্ট অ্যাটাক কম হয়েছে শতকরা ৩৭ ভাগ। দ্বিতীয় গবেষণাটি করা হয় মহিলাদের নিয়ে। ৮৭ হাজার মহিলাকে নিয়ে আট বছরের এক উদ্যোগ নেয়া হয়। সেখানে দেখা গেছে, দুই বছরের বেশি সময় দৈনিক ১০০ আইইউ ভিটামিন-ই গ্রহণে মহিলাদের হার্ট এ্যাটাক শতকরা ৪১ ভাগ কমেছে।

--- মুখে কোনও ক্ষতচিহ্ন থাকলে তার উপশমে ভিটামিন ই অব্যর্থ! অ্যান্টি অক্সিড্যান্টে ভরপুর ভিটামিন ই ত্বকের নিজে থেকে সেরে ওঠার ক্ষমতাকে আরও জোরদার করে। মুখে ব্রণর ক্ষতচিহ্ন থাকলে একটা ভিটামিন ই ক্যাপসুল আধখানা করে কেটে ভিতরের তেল সরাসরি দাগের উপর লাগান। ভিটামিন ই ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন বাড়িয়ে দ্রুত ক্ষতচিহ্ন সারিয়ে তোলে।

----বলিরেখা সারাতে ভিটামিন ই অত্যন্ত কার্যকরী। ভিটামিন ই-র নিয়মিত ব্যবহার ত্বকের বয়স বাড়তে দেয় না। ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু সারিয়ে ত্বক কোমল, সুন্দর করে তোলে ভিটামিন ই।

---মুখে দাগছোপ বা ত্বকের রং সব জায়গায় সমান না হলেও একমাত্র ওষুধ ভিটামিন ই। ত্বকের কোনও অংশে মেলানিন বেশি জমে গেলে সেই অংশের রং অন্যান্য অংশের চেয়ে কালো দেখায়। ত্বকের কালো অংশে ভিটামিন ই লাগালে তা ধীরে ধীরে হাইপারপিগমেন্টেশন কমিয়ে ত্বকের রং স্বাভাবিক করে তোলে।

---হাতের ত্বক শুকনো হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। সাধারণ ক্রিম বা ময়েশ্চারাইজ়ার দিয়ে তা কমানো যায় না। হাতের চামড়া কুঁচকেও যায় অনেকের। এমন ক্ষেত্রে ভিটামিন ই ক্যাপসুল কেটে সেই তেল হাতের ত্বকে সরাসরি ক্রিমের মতো মেখে নিন। নিয়মিত ব্যবহারে চোখে পড়ার মতো তরুণ দেখাবে হাতের ত্বক।

---- ফাটা ঠোঁটের সমস্যায় বছরভর কষ্ট পান? প্রতিদিনের লিপবামের বদলে ব্যবহার করুন ভিটামিন ই তেল। ঠোঁটের রং কালো হয়ে গেলেও ভিটামিন ই তেলে ফল পাবেন।

----সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির হাত থেকে ত্বককে বাঁচাতেও আপনার ভরসা ভিটামিন ই। মুখে সানস্ক্রিন লাগানোর আগে ভিটামিন ই তেল মেখে নিন। বিকল্প হিসেবে ভিটামিন ই যুক্ত সানস্ক্রিনও ব্যবহার করতে পারেন।

-- শরীরের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিটামিন-ই গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়। এসব হচ্ছে-
-অন্ত্রের অসুখ, লিভার বা যকৃতের অসুখ, অগ্ন্যাশয়ের অসুখ, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পাকস্থলী অপসারণ।

যে শিশু টিনের দুধ খায় তাদের ভিটামিন-ই এর ঘাটতি হতে পারে। মূলত পলি স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে ভিটামিন-ই এর প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়।

-- গবেষণায় জানা গেছে যে, ব্যায়াম পরবর্তী পেশী বেদনা লাঘবে ভিটামিন ‘ই’ বেশ কার্যকর। এক্ষেত্রে ভিটামিন ‘ই’ এর ফ্রী র‌্যাডিক্যাল রোধী বা এ্যান্টি অক্সিডেন্ট
ভূমিকাই কাজ করে। এমনিতে ফ্রী র‌্যাডিক্যাল  পেশীর  ছোট-খাটো কাটাছেঁড়া  মেরামত করে।  কিন্তু ফ্রী র‌্যাডিক্যালের
সংখ্যা বেড়ে গেলে তা পেশীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াঁয়। ভিটামিন ‘ই’ সেবনে ফ্রী র‌্যাডিক্যালের সংখ্যা কমে যায়
এবং পেশীর ব্যাথা নিরাময় হয়।


এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের র্হাভার্ড মেডিক্যাল স্কুল কর্তৃক প্রকাশিত এক হেলথ রিপোর্টে বলা হয় যে, ভিটামিন  ‘ই’
এর ক্ষমতার মধ্যে আরও দুটো বৈশিষ্ট্য অর্ন্তভুক্ত করা যায় যেগুলো হৃদরোগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উপকারী ভূমিকা পালন
করে। এ দুটো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রদাহ নিবারণ ও মসৃণ মাংস পেশীর কোষ প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করা। মাংস পেশীর কোষ উৎপাদন  ক্ষমতার  সংগে  প্রদাহ  নিবারণ  ক্ষমতা  এ  দুটো  গুণ  রক্তনালীর  সংকীর্ণ  হওয়াকে  প্রতিরোধ  করে।  এন্টিঅক্সিডেন্ট ক্রিয়া ছাড়াও এই দুই গুণাবলীর কারণে ভিটামিন ‘ই’ হৃদরোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আরও
উল্লেখ্য যে, ভিটামিন ‘ই’ এর সাহায্য ছাড়া দেহে ভিটামিন ‘এ’র শোষণ ও মজুদ হওয়া কঠিন।
ভিটামিন ‘ই’ এর ক্যান্সাররোধী গুণাবলীর কথাও জানা গেছে।

-ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার খান:

বাদাম, খাদ্যশস্য, ভুট্টার ভ্রুণ এবং গাঢ় সবুজ শাকসবজি ভিটামিন-ই এর চমৎকার উৎস। আপনার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় এসব খাবার রাখুন।

১) সূর্যমুখীর বীজ : সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভিটামিন ই। প্রতি ১০০ গ্রাম সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে ৩৬.৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই। এই বীজ থেকে যে তেল তৈরি করা হয় তা সাধারণত সালাদ, স্যুপ বা গার্নিশে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া অন্যান্য রান্নাতেও সূর্যমুখীর তেল ব্যবহার করা যায়। এতে কোনো কোলেস্টেরল নেই, রক্তচাপ ও হৃদরোগীরা অনায়াসে তা খেতে পারেন।

 ২) লাল মরিচের গুঁড়া : ঝালের কারণে আমরা অনেকেই মরিচ কম খেয়ে থাকি। অবাক হলেও কথা সত্য। জেনে অবাক হতে পারেন, সর্বোচ্চ ভিটামিন ই সমৃদ্ধ খাবারের তালিকায় আছে লাল মরিচের গুঁড়া! প্রতি ১০০ গ্রাম লাল মরিচের গুঁড়ায় রয়েছে ২৯.৮৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই। আমাদের রোজকার খাবারে আমরা মরিচের গুঁড়া ব্যবহার করে থাকি। তাই আমাদের শরীরে ভিটামিন ই-এর অভাব সচরাচর ঘটে না।

৩) কাঠ বাদাম : আমন্ড বা কাঠবাদাম ভিটামিন ই-এর জন্য বেশি জনপ্রিয়। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঠবাদামে রয়েছে ২৬.২২ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই। দাম বেশি বলে কাঠবাদাম খাবার হিসেবে খুব বেশি প্রচলিত নয়। সাধারণত ক্ষীর, পায়েস, মিষ্টি, সন্দেশ, হালুয়াসহ অন্যান্য খাবার তৈরিতে অনুষঙ্গিক উপকরণ হিসেবে কাঠবাদাম ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কাঠবাদামের দুধ ও মাখনও ভিটামিন ই-এর ভালো উত্‍স।

৪) পেস্তা বাদাম : কাঠবাদামের পরেই রয়েছে পাইন নাট বা পেস্তা বাদাম। প্রতি ১০০ গ্রাম পেস্তা বাদামে রয়েছে ৯.৩৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই। কাঠবাদামের মতোই পেস্তা বাদামও আমাদের দেশে বিভিন্ন খাবার তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

৫) চীনা বাদাম : চীনা বাদাম খেতে পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুব কমই আছেন! বাদাম ভাজা বেশ মুখরোচক একটি খাবার। প্রতি ১০০ গ্রাম চীনা বাদামে রয়েছে ৬.৯৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই। চীনাবাদাম নানা খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। চীনাবাদামের মাখনও বেশ উপকারী।

৬) ভেষজ: ভেষজের মধ্য বেসিল ও অরিগানোতে রয়েছে সর্বোচ্চ ভিটামিন ই। প্রতি ১০০ গ্রাম বেসিল ও অরিগানোতে রয়েছে ৭.৪৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই। পাস্তা, পিজা, সালাদ ও স্যান্ডউইচ তৈরির উপকরণ হিসেবে বেসিল এবং অরিগানো ব্যবহার করা হয়।

৭) শুকনো এপ্রিকট : এপ্রিকটকে বলা হয় খাদ্যআঁশ ও নানা ভিটামিনের উত্‍কৃষ্ট উত্‍স। প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো এপ্রিকটে রয়েছে ৪.৩৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই।

৮) জলপাইয়ের আচার : ভিটামিন ই-এর একটি উত্‍কৃষ্ট উত্‍স হিসেবে গণ্য করা হয় কাঁচা জলপাইকে। তবে কাঁচা জলপাইয়ের আচার হলো ভিটামিন ই-এর একটি ভালো উত্‍স। প্রতি ১০০ গ্রাম জলপাইয়ের আচারে রয়েছে ৩.৮১ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই।

৯) পালং শাক : রান্না করা পালং শাক আয়রন, ক্যালসিয়াম ও খনিজ পদার্থের আধার হিসেবে পরিগণিত হয়। এতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ই-ও। প্রতি ১০০ গ্রাম রান্না করা পালং শাকে রয়েছে ৩.৫৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই।

 ১০) কচুর মূল : আয়রন ও ক্যালসিয়ামের সর্বোত্‍কৃষ্ট উত্‍স হলো কচুর মূল। এটি আমাদের দেশে অতি সহজলভ্য একটি খাবার। আলুর বিকল্প হিসেবেও কচুর মূল খাওয়া যায়। সর্বোচ্চ ভিটামিন ই সমৃদ্ধ খাদ্য তালিকার দশ নম্বরে রয়েছে কচুর মূল। প্রতি ১০০ গ্রাম কচুর মূলে রয়েছে ২.৯৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই।


জলপাইয়ের আচার: ভিটামিন ‘ই’ এর একটি উৎকৃষ্ট উৎস হিসেবে গণ্য করা হয় কাঁচা জলপাইকে। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা জলপাইয়ের আচারে রয়েছে ৩.৮১ মিলিগ্রাম ভিটামিন ই।

খাবার রান্না করলে এবং সংরক্ষণ করে রাখলে ভিটামিন-ই কিছুটা নষ্ট হয়। শুধু ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে সেটি সুন্দর খাবারের বিকল্প হতে পারে না এবং সেটি শরীরে শক্তিও উৎপন্ন করতে পারবে না। অন্যান্য খাদ্যের উপস্থিতি ছাড়া ভিটামিনগুলো নিজেরা কাজ করতে পারে না। শরীরে ভিটামিন-ই এর শোষণের জন্য কিছুটা চর্বির প্রয়োজন হয়।
ভিটামিন-ই পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনে, যেমন- ডি-কিংবা ডিএল আলফা টকোফেরিল অ্যাসিটেট, ডি-কিংবা ডিএল-আলফা টকোফেরল এবং ডি-কিংবা এল-আলফা টকোফেরিল এসিড সাক্সিনেট।

আপনি যদি প্রেসক্রিপশন ছাড়া ভিটামিন-ই গ্রহণ করেন, তাহলে লেবেলের লেখাগুলো ভালো করে পড়ে নেবেন এবং কোনো ধরনের সতর্কতার উল্লেখ থাকলে সেটি মেনে চলবেন। কিছু ক্ষেত্রে ভিটামিন-ই গ্রহণে সতর্ক হতে হবে-

অ্যালার্জি : ভিটামিন-ই গ্রহণের পর কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় কিংবা অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসককে জানাতে হবে।

গর্ভাবস্থা : এটি গুরুত্বপূর্ণ, যখন আপনি গর্ভবতী হচ্ছেন তখন পর্যাপ্ত ভিটামিন গ্রহণ করছেন। তবে আপনাকে দেখতে হবে গর্ভাবস্থার পুরো সময়টা আপনি সঠিক মাত্রায় ভিটামিন গ্রহণ করছেন কি না, কেননা ভ্রুণের বিকাশ এবং বৃদ্ধি নির্ভর করে মায়ের সঠিক পুষ্টি গ্রহণের ওপর। গর্ভাবস্থায় বেশি মাত্রায় ভিটামিন গ্রহণ করলে ক্ষতি হতে পারে, তাই বেশি মাত্রায় ভিটামিন গ্রহণ করবেন না।

বুকের দুধ : শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য স্তনদানরত মহিলার সঠিকমাত্রায় ভিটামিন গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে থাকেন তা হলে মাঝে মধ্যে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এ ক্ষেত্রে শিশুকে অন্য উপায়ে ভিটামিন দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে আপনি যদি বুকের দুধ খাওয়ানোকালে অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন গ্রহণ করেন তাহলে আপনার নিজের জন্য এবং শিশুর জন্য সেটি ক্ষতিকর হবে।

শিশু : দৈনন্দিন সুপারিশকৃত মাত্রা গ্রহণের ফলে শিশুর অসুবিধার কথা জানা যায়নি। শিশু বুকের দুধ খেলে তাকে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন দেয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গবেষণায় দেখা গেছে নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্মগ্রহণকারী শিশুর শরীরে ভিটামিন-ই এর মাত্রা কম থাকে। আপনার চিকিৎসক এ ব্যাপারে ভিটামিন-ই এর মাত্রা নির্ধারণ করে দেবেন।

প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ : দৈনন্দিন সুপারিশকৃত মাত্রা গ্রহণের ফলে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধার কথা জানা যায়নি।

অন্য ওষুধ গ্রহণ : আপনি যদি ভিটামিন-ই গ্রহণের সময় অন্য কোনো ওষুধ খেতে থাকেন তা হলে অবশ্যই চিকিৎসককে জানাবেন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দুটি ওষুধের মধ্যে প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করতে পারেন কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে বলতে পারেন।
অন্যান্য চিকিৎসাগত সমস্যা : অন্য কোনো চিকিৎসাগত সমস্যা উপস্থিত থাকলে ভিটামিন-ই গ্রহণের ফলে অবস্থা খারাপ হতে পারে। আপনার অন্য কোনো চিকিৎসাগত সমস্যা আছে কি না সেটি চিকিৎসককে অবশ্যই জানাবেন, বিশেষ করে আপনার যদি রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা থাকে।

দৈনিক ৪০০ ইউনিটের বেশি এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিটামিন-ই গ্রহণ করলে নিুলিখিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটে-

চোখে ঝাপসা দেখা,  ডায়রিয়া, মাথাঘোরা, মাথাব্যথা, বমিবমি ভাব, পেট কামড়ানো, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা।
এক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে পরিমিত পরিমাণে ভিটামিন-ই গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।