Showing posts with label World. Show all posts
Showing posts with label World. Show all posts

Tuesday, 25 October 2022

ডার্টিবম্ব কি এবং রাশিয়া এটি নিয়ে কি অভিযোগ করছে ?

সম্প্রতি রাশিয়া একটি অভিযোগ জানিয়েছে যে ইউক্রেন খেরসন অঞ্চলের ওপর ডার্টি বম্ব ব্যবহার করতে পারে। আপনারা সকলেই আশা করি জানেন, ইউক্রেনের পূর্ব দিকের রুরূহানস্ক থেকে শুরু করে ক্রিমিয়া অব্দি অঞ্চল বর্তমানে রাশিয়ার অধীনে হয়ে গেছে। এই অঞ্চলের মধ্যে ডোনেস্ক, মারিওপোল এই অঞ্চলগুলিও পড়েছে। রাশিয়া দাবি করেছে, এই অঞ্চল গুলো তাদের অধীনে।

মঙ্গলবার ইউক্রেনের এই ডার্টি বম্ব এর বিষয়টি নিয়ে ইউনাইটেড নেশন সিকিউরিটি কাউন্সিলকে সতর্ক করে রাশিয়ান ইউএন অ্যাম্বাসেডর ভেসেলি নেবেনজিয়া ইউ এন সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্টনিও গুত্রেসকে একটি চিঠিতে জানান, 'আমরা কিয়েভ এর দ্বারা ডার্টি বোম্ব ব্যবহার করাকে 'এক্ট অফ নিউক্লিয়ার টেরোরিজম' হিসাবে মনে করবো।'



রাশিয়ান অফিসিয়ালরা পশ্চিমা দেশগুলির ডিফেন্স মিনিস্টারদের ফোন করেছিল, এছাড়া ইউ এস, ফ্রান্স এবং তুর্কির ডিফেন্স মিনিস্টারের সাথেও কথা বলেছিল।
এর সাথে খেরশন অঞ্চলের বাসিন্দাদের রাশিয়ার পক্ষ থেকে সরে যেতে বলা হয় এবং ডার্টি বম্ব সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। এদিকে ফ্রান্স ইউকে এবং ইউ এস একটি একত্রিত উত্তরে জানায়, তারা এই তথ্যটিকে খারিজ করে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেস্কি এই বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং বলেন 'যত ধরনের ডার্টি খবর রাশিয়া ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।' রাশিয়া এ সম্পর্কে কোন প্রমাণ তুলে ধরেন নি।

এখন প্রশ্নটি হল ডার্টি বোম্ব আসলে কি জিনিস? এটা নিয়ে এত চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে কেন?
এটি একপ্রকার গতানুগতিক বিস্ফোরক তবে অন্যান্য বোবিস্ফোরকের থেকে পার্থক্য হল এর মধ্যে তেজস্ক্রিয় মেটেরিয়াল যেমন ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয় যা পারমাণবিক বোমায় ব্যবহৃত হয় এর ফলে এই বিস্ফোরকটি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে যায়, এই জন্য একে ডার্টি বোম্ব বলা হয়। কিন্তু এখানে বিষয় হলো নিউক্লিয়ার বোমে যে সকল প্রকার মেটেরিয়াল, রিফাইন করা মেটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়, এটি খুব লম্বা ও জটিল, সময় সাপেক্ষ বিষয় হয়। কিন্তু ডার্টি বম্বের ক্ষেত্রে এত রকমের রিফাইন রেডিওএকটিভ মেটিরিয়াল ব্যবহার করা হয় না বরঞ্চ, এর রেডিওএকটিভ উপাদানগুলি খুব সহজে যেমন - হসপিটালের রেডিওএকটিভ ওয়েস্ট থেকে এছাড়া নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন ও রিসার্চ ল্যাবরেটরি থেকে জোগাড় করা রেডিও একটিভ পদার্থ গুলি এক্সস্ট্র্যাক্ট করা হয় ও তার থেকে সাধারণ বিস্ফোরকের মতই তৈরি করা হয়। তবে এই বোমার বিস্ফোরণের ফলে পরিবেশে চারিদিকে তেজস্ক্রিয় উপাদানগুলি ছড়িয়ে পড়ে যা বেঁচে থাকা যে কোন প্রাণীর পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক হয়। খুব বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে যাতে সেই এলাকা খালি করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।
এই অস্ত্রটিকে 'ওয়পেন অফ মাস ডিস্ট্রাকশন' বলা হয় কারণ 'ফেডারেশন অফ আমেরিকান সাইন্টিস্ট' একটি ক্যালকুলেশন করে জানিয়েছিল যদি এই প্রকার একটি বিস্ফোরকে যাতে সাধারণত ৫ কেজি টি এন টি থাকে তার সাথে নয় গ্রাম কোবাল্ট মিশ্রিত থাকে এবং এটি ম্যানহাটনের মত শহরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় তবে কয়েক দশক ধরে সেই অঞ্চলে কোন প্রাণী বসবাস করতে পারবে না। কিন্তু এই ধরনের অস্ত্রগুলি একদমই সঠিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয় তার কারণ হচ্ছে, এই বোমাটি যে অঞ্চলে বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে সেখানে বাতাস জোরে বইলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই পাউডার আকৃতির রেডিও এক্টিভ মেটেরিয়াল গুলি ছড়িয়ে পরে যার ফলে এটি কেবলমাত্র লক্ষ্য বস্তু অর্থাৎ খেরসনের মত অঞ্চলের বিস্ফোরণ ঘটালে শুধুমাত্র এই অঞ্চলে নয় এর আশেপাশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এটি ছড়িয়ে পড়বে এবং সমস্যা সৃষ্টি করবে।




প্রশ্ন হচ্ছে রাশিয়া এই দাবিটি কেন করছে? যেখানে ইউক্রেন ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশগুলি এটি খারিজ করে দিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে রাশিয়া আসলে নাটোর অ্যালায়েন্সকে ভাঙতে চাইছে, ইচ্ছা করে এই খবর ছড়িয়ে পাশ্চাত্য দেশগুলি ইউক্রেনকে যে সাহায্য করছিল তা বন্ধ করার চেষ্টা করছে; সে দেখাতে পারে ইউক্রেন এই সাহায্যের অপব্যবহার করছে; এছাড়া কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, রাশিয়া হয়তো নিজেই এই বিস্ফোরকটি ব্যবহার করবে এবং অপরাধটি ইউক্রেনের উপর চাপিয়ে দিতে পারে।
যদিও বহু মিলিটারি অ্যানালিস্ট এর মতে এই ধরনের ভাবনাচিন্তা ভুল কারণ, রাশিয়ার এতটাও বোকা না যে নিজের জনগণ ও সেনার উপর এই ধরনের বোমার ব্যবহার করবে।




এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এখনো অব্দি কি ডার্টি বোম্বের কোনো ব্যবহার পৃথিবীতে হয়েছে?
এখনো পর্যন্ত সাফল্যের সাথে এর ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি যদিও অনেকবার চেষ্টা করা হয়েছে।
যেমন - ১৯৯৬ সালে চেচেনয়া যুদ্ধ চলাকালীন চেচেন বিদ্রোহীরা মস্কোর ইজমাইলোভো পার্কে ডায়নামাইট এবং সিজিয়াম ১৩৭ এর সংমিশ্রনে তৈরি এই বিস্ফোরকটি পুঁতে রেখেছিল। এখানে সিজিয়ামটি ক্যান্সার চিকিৎসা করার যন্ত্রপাতি থেকে এক্সট্রাক্ট করা হয়েছিল; এরপর সিকিউরিটি সার্ভিস এই স্থানটি খুঁজে বের করে এবং ডিফিউজ করে দিয়েছিল।
এর ঠিক দুই বছর পর চেচেনয়া ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস জানতে পারে সেখানকার রেলওয়ে লাইনে একটি ডার্টি বোম্ব পুতে রাখা হয়েছে এবং তারা এটিকে নিষ্ক্রিয় করে।
চার বছর বাদে ২০০২ সালে এক ইউ এস নাগরিক যে আলকায়েদার সাথে যোগাযোগে ছিল, তাকে চিকাগো থেকে ডার্টি বোম্বের আক্রমণ করার পরিকল্পনা করার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীকালে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।




এর দু বছর বাদে এক ব্রিটিশ নাগরিক এবং আল-কায়েদার সদস্যকে একই রকম কারণের জন্য গ্রেপ্তার করা হয় এবং 30 বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এখনো অবধি নিউক্লিয়ার বোমা ব্যবহার করা দেখা গেলেও এই বিস্ফোরকটির ব্যবহার কোথাও সাফল্যের সাথে করা যায়নি। প্রশ্ন হল এখন যা পরিস্থিতি আমরা ভবিষ্যতে এর ব্যবহার দেখতে পারব? আপনাদের কি মনে হয়? যদি এটি ঘটে তাহলে তা পৃথিবীতে একটি বিশাল বড় আলোড়নের সৃষ্টি হবে।

Monday, 2 August 2021

সূর্যের ধ্বংসের পর কি পৃথিবীতে প্রাণ থাকবে? নতুন গবেষণায় আশার আলো ---

বেশির ভাগ মানুষের ধারণা ছিল যখন আমাদের সূর্য ধ্বংস হবে তখন পৃথিবীতে তার ক্যাটাস্ত্রফিক প্রভাবে কোন কিছু টিকে থাকতে পারবে না কিন্তু নতুন গবেষণায় একটি আশার আলো পাওয়া গিয়েছে যাতে সূর্যের নিভে যাওয়ার পর পরই আমাদের গ্রহে আবার নতুন করে প্রাণের উৎপত্তি হতে পারে।

পৃথিবীর ম্যাগনেটিক শিল্ড বা চুম্বক বলয় সোলার উইন্ড বা সৌর ঝড়ের উত্তপ্ত চার্জড পার্টিকেল বা কণাগুলি থেকে পৃথিবী কে রক্ষা করে চলেছে।  এই পার্টিক্যাল গুলি ঘন্টায় প্রায় 1 মিলিয়ন মাইল বা 1.6 মিলিয়ন কিলোমিটার বেগে আমাদের গ্রহের দিকে ধেয়ে আসে যদিও 5 বিলিয়ন বছর পরে আমরা এখনকার মতো এতটা সৌভাগ্যবান থাকবো না, কারণ তখন এই সোলার উইন্ড সূর্যের মৃত্যুর প্রাক্কাল থেকে অতীব শক্তিশালী হয়ে উঠবে। 



সূর্যের ধ্বংসের শেষ ধাপে এটির হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে এবং এটি একটি লাল দানবে পরিণত হবে। এই সময় সৌর ঝড় এত শক্তিশালী হবে যে, এটি পৃথিবীর ম্যাগনেটিক শিল্ডকে ধ্বংস করে দেবে যার ফলে আমাদের বায়ুমণ্ডলের বেশিরভাগ অংশই মহাকাশে বিলীন হয়ে যাবে। 

যার অর্থ দাঁড়ায় আমাদের গ্রহে সূর্যের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরক্ষা কবচ থাকবে না এবং জীবন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে।



এক বিলিয়ন বছরের কাছাকাছি সময় বাদে সূর্য একটি শ্বেত বামনে পরিণত হবে এবং তার কয়েক বিলিয়ন বছরে এটি সম্পূর্ণ মৃত হয়ে যাবে যা কোন রকমের আলো উৎপন্ন করতে পারবে না। এছাড়া সূর্যের আকর্ষণ ক্ষমতা এত দুর্বল হয়ে যাবে যে আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলি এখনকার অবস্থান থেকে প্রায় দ্বিগুণ দূরত্বে চলে যাবে।

গবেষকরা সোলার উইন্ড 'radiating' করা আমাদের সূর্যের থেকে 1 থেকে 7 গুণ বেশি ঘনত্ব সম্পন্ন বিভিন্ন নক্ষত্রের মডেল তৈরি করে উপলব্ধি করেছে যে, সূর্যের এই বিবর্তন চলাকালীন আমাদের ম্যাগনেটিক ফিল্ডকে অক্ষত থাকতে হলে বর্তমানের থেকে এটিকে অন্তত 1000 গুন বেশী শক্তিশালী হতে হবে।



দিমিত্রি ভেরাস যিনি ইউ. কে এর 'ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির' এস্ট্রোফিজিসিস্ট, দাবি করেছেন, এই গবেষণাটি প্রদর্শন করছে স্টেলার এভলিউশনের জায়েন্ট ব্রাঞ্চ ফেসগুলি অবিচ্ছিন্নভাবে চলাকালে একটি গ্রহের নিজস্ব প্রটেক্টিভ ম্যাগনেটোস্ফিয়ার মেন্টেন করার সমস্যা গুলিকে।



যদিও এটি শুনে যতটাই ধ্বংসাত্মক মনে হয় তবুও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ জীবনের পক্ষে একটি আশার ছোট আলো পাওয়া যায়। যেহেতু শ্বেত বামনের থেকে কোন সৌর ঝড় বা সোলার উইন্ড নির্গত হতে পারে না, তাই একটি সম্ভাবনা থাকে যে আমাদের গ্রহ আবার বসবাসযোগ্য হতে পারে। তাই লাল দানবের থেকে আসা শক্তিশালী ঝড়ের বোমা বর্ষণের শেষ হওয়ার পর আবার নতুন করে প্রাণের বিবর্ধন শুরু হতে পারে। এটা সেই সকল গ্রহ যারা শ্বেত বামনকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে তাদের পক্ষেও প্রাণের সূচনার পক্ষে একটি ভালো খবর। এই গবেষণাটি " monthly notices of the the royal astronomical society"  নামক জার্নালে প্রকাশিত করা হয়েছে যেখানে আপনারা এটিকে সম্পূর্ণরূপে পড়তে পারেন।

Sunday, 19 July 2020

বাস্তব জীবনের নায়ক যারা পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন - পর্ব 3 --

খুব কম বৈজ্ঞানিকই নরমান বর্লোগের মত এত পুরস্কার পেয়েছেন এবং বলতে গেলে এতগুলি পুরস্কার এই বাস্তব জীবনের নায়কেরই প্রাপ্য। পৃথিবীতে বিলিয়ন এর ওপর জীবন বাঁচানোর কৃতিত্ব খুব কম বৈজ্ঞানিকই পেয়েছেন।

বর্লোগ আগের দুজনের মতো চাপের পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় মুহুর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়, বরঞ্চ কঠোর পরিশ্রমে পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন। বিংশ শতকের শুরুর দিকে আমাদের গ্রহ কৃষিজাত উৎপাদনের পতনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিপদের সম্মুখীন হয়। যদি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না ঘটতো তবে, চারিদিকে বিশাল দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়তো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিতে খুবই ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলত। 'ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা'র থেকে স্নাতক হওয়ার পর ফরেস্ট্রি, প্লান্ট প্যাথলজি এবং জেনেটিক্সে ডিগ্রী নিয়ে নরমান বর্লোগ তার কাজ শুরু করেন।

1942 সালে তাকে রকফেলার ফাউন্ডেশনের মেক্সিকোয় অবস্থিত 'ম্যাক্সিকান এগ্রিকালচারাল প্রোগ্রাম' কো-অপারেটিভের বৈজ্ঞানিক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি সেখানে 1944 থেকে 1960 সাল পর্যন্ত কাজ করেন। এই সময় যেসকল কৃষকেরা রোগগ্রস্ত এবং গম উৎপাদক শস্য নিয়ে সমস্যায় থাকতো, তিনি তাদের সাহায্য করার উপায় খুঁজছিলেন। তিনি গমের প্রজাতিগুলি নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন তিনি এমন একটি প্রজাতি খুঁজছিলেন যা বিভিন্ন পরিবেশে পৃথিবীর যেকোন স্থানে বেড়ে উঠতে পারে। যখন তিনি এরকম কিছু খুঁজে পেলেন না, তিনি একটি তৈরি করে ফেললেন। গ্রাজুয়েট হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে বর্লোগ একটি রোগ প্রতিরোধী গমের প্রজাতি তৈরি করলেন যেটা অন্যান্য গুলি থেকে অনেক বেশি পরিমাণে এবং ভালোভাবে বেড়ে উঠতে সক্ষম, যারা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও টিকে থাকতে পারতো - তার এই কাজ প্রথমদিকের উদ্ভিদের জেনেটিক মিউটেশন সংক্রান্ত আবিষ্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম। 

মেক্সিকোতে বর্লোগ সাফল্য পাওয়ার পর ভারতীয় এবং পাকিস্তানী সরকার তাকে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করে এবং রকফেলার ফাউন্ডেশন এবং ইউনাইটেড নেশন এর 'ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন' এর সহায়তায় তিনি এশিয়া মহাদেশের তার কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেন। যেখানে ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশে সেইসময় প্রচুর পরিমাণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্যশস্যের ঘাটতি দেখা দিচ্ছিল, সেই সময়ে অর্থাৎ 1960 সালে বর্লোগ সেখানে ফসল উৎপাদনের প্রায় 60 শতাংশ বৃদ্ধির জন্য দায়ী ছিলেন। তিনি উভয় দেশকেই কৃষিতে আত্মনির্ভর হতে সাহায্য করেছিলেন।

তার এই নতুন গমের প্রজাতি দিয়ে বর্লোগ উন্নয়নশীল দেশগুলির লাভজনক রপ্তানি, একটি স্থায়ী খাদ্যের উৎপাদন ক্ষেত্র এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি করতে সাহায্য করলেন। গবেষণায় বলা হয়েছিল যে তিনি এই হস্তক্ষেপ না করলে 1980 সালের মধ্যে কেবল ভারতীয় উপমহাদেশে  বিলিয়নের ওপর মানুষের অনাহারে মৃত্যু ঘটতো যেখানে বর্তমানে এখানে জনবিস্ফোরণ ঘটছে। 

1970 সালে তিনি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পান। তাকে 'ফাদার অফ গ্রীন রিভলিউশন' বলা হয়। তিনি 'ট্রিটিক্যাল' নামক একপ্রকার গম ও রাই এর শংকর প্রজাতি তৈরি করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তার এই পদ্ধতি অবলম্বন করে অন্যান্যরা বিভিন্ন নতুন প্রজাতির উচ্চ উৎপাদনশীল ধানের সৃষ্টি করেছিল। তার এই ধরনের কার্য প্রণালী দ্বারা তিনি আরো বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশকে সাহায্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে 1960-69 সালে বর্লোগ 'ইন্টার আমেরিকান ফুড ক্রপ' প্রোগ্রামের ডাইরেক্টর হিসাবে কাজ করেছিলেন এবং 1964 থেকে 1979 সালে মেক্সিকো সিটির 'ইন্টারন্যাশনাল মেজ এন্ড হুইট ইমপ্রুভমেন্ট সেন্টারের' ডাইরেক্টর হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন।

বর্তমানে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বাসিন্দা হিসাবে আপনার কেমন লাগছে? আজ  আমরা যে খাদ্য শস্য খেয়ে বেঁচে আছি নিত্যনৈমিত্তিক ভালো-মন্দ যা কিছুই হোক করতে পারছি তার পেছনে এই মানুষটির আবদান কোথাও না আছে ?

Sunday, 12 July 2020

বাস্তব জীবনের নায়ক যারা পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন - পর্ব 2 --

বন্ধুরা আশা করি আপনারা ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার সোভিয়েত ও আমেরিকার চরমতম পর্যায় 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' সম্পর্কে শুনেছেন - যে সময় পুরো পৃথিবী শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল।  যেকোনো মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হতে পারে এবং পৃথিবী ধ্বংস শুরু হয়ে যেতে পারে।
আমাদের এইবারের নায়ক ভাসিলি আর্কিপভ এর নাম ঠিক এই সময় উঠে আসে। 1962 সালে এই 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' চলাকালীন তিনি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে তিনি একা হাতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আটকে দিয়েছিলেন। এই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধটি হয়নি একজন কম কথা বলা, ঠান্ডা মাথার শান্ত রাশিয়ান সাবমেরিন অফিসার - যার জন্য আমরা আজ বেঁচে আছি।

1962 সালের 27 অক্টোবর সোভিয়েত সাবমেরিন বি-59 এর 3 কমান্ডার এর মধ্যে একজন ছিলেন ভাসিলি। এই সময় উত্তেজনা চরমে ছিল; একটি আমেরিকান গুপ্তচর প্লেন কিউবার ওপরে গুলি করে নামানো হয় এবং একটি U-2 সোভিয়েত আকাশ সীমানায় হারিয়ে যায়। সোভিয়েত লিডারশিপ থেকে ক্যারিবিয়ান এর কাছে থেমে যাওয়ার আদেশ আসে। কারণ এই সময় আমেরিকানরা কিউবাকে ঘিরে রেখেছিল। এই সাবমেরিনটি আসলে আইসল্যান্ডে গোপনভাবে অস্ত্র-সরঞ্জাম পৌঁছানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল। আমেরিকানদের থেকে নিজের অবস্থান লুকানোর জন্য সাবমেরিন ডুবোজাহাজ সমুদ্রের গভীরে অবস্থান করছিল কিন্তু সেটি যথেষ্ট গভীর ছিল না।


ডুবোজাহাজটিকে ইউ এস ফোর্সের  'ইউ এস এস বেল' নামক একটি আমেরিকান ডেস্ট্রয়ার স্পট করে এবং non-lethal ডেপথ চার্জ করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সাবমেরিনকে উপরে উঠে আসার জন্য সতর্ক করা। একজন ইন্টেলিজেন্স অফিসার ভাদিন অর্লভ এর মতে, "আমেরিকানরা গ্রেনেডের থেকে একটু শক্তিশালী কিছু দিয়ে আঘাত করছিল অর্থাৎ একপ্রকার 'পার্টিকেল depth bomb', আমরা ভেবেছিলাম এটা শেষের শুরু।"

 তবে আমেরিকানরা এটি জানত না যে এই বি-59 সাবমেরিনটি ভয়ংকর ভাবে অস্ত্রশস্ত্রে পরিপূর্ণ ছিল এবং তাদের সংগ্রহে একটি বিশেষ অস্ত্র রয়েছে - একটি 10 কিলো টন নিউক্লিয়ার টর্পেডো যা ডুবোজাহাজের অফিসাররা মস্কোর অনুমতি ছাড়াই লঞ্চ করার ক্ষমতা রাখেন। যেটি হিরোশিমায় ফেলা পরমাণু বোমাটির মত শক্তিশালী ছিল। ডুবন্ত অবস্থায় উপরিভাগের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল ফলে মস্কোর সাথে যোগাযোগ করা বা তাদের আদেশ পাওয়ার কোন উপায় ছিল না । উপরের সাথে কোন সংযোগ করতে না পারায় সাবমেরিনের কর্মীরা বুঝতে পারছিলেন না ইউ এস জাহাজগুলির আসল উদ্দেশ্য কি। তারা ধরে নিয়েছিলেন যে হয়ত এবার তারা আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের সম্মুখীন হতে চলেছেন।  ক্রমাগত depth charge এর ফলে সাবমেরিনটি কাঁপতে শুরু করেছিল  ফলে, ডুবোজাহাজের 2 জন কমান্ডার মিসাইল চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, যার মধ্যে ভ্যালেন্তিন সভিৎস্কি ছিলেন।  'ইউ এস ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ' অনুযায়ী, সভিৎস্কি বলেছিলেন, "আমরা হয়তো মরে যাব, কিন্তু আমরা সব ধ্বংস করে দেবো। আমরা তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দেবো, আমরা নৌবাহিনীকে হারের লজ্জা দিতে পারব না।" কিন্তু টর্পেডো মিসাইলটি ছাড়ার জন্য তিনজন কমান্ডারের অ্যাপ্রুভাল দরকার ছিল। এখানেই আসেন ভাসিলি আর্কিপভ; তিনি এই ডেপ্থ চার্জের মুহূর্তে নিজের মাথা ঠান্ডা রাখতে সক্ষম হন। তিনি সন্দেহ করছিলেন এগুলি কোন আক্রমণ না বরং তাদেরকে উপরে আসার জন্য প্রলোভিত করা হচ্ছে। অস্ত্রটি নিক্ষেপ করার অনুমতি দেননি এবং অন্যান্য ক্যাপ্টেনদের শান্ত করেন।


যদি ডুবোজাহাজটি আমেরিকানদের উড়িয়ে দিতো তবে সেই পরমাণুবোমার মেঘ সমুদ্র ছাড়িয়ে স্থলে এসে পৌঁছত অবশ্যই। আমেরিকা তাদের নিজস্ব নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড মস্কো এবং অন্যান্য শত্রুর উদ্দেশ্যে পাঠাতো এবং তার বদলে রাশিয়ানরা লন্ডন এবং আনজিলা এবং জার্মানির কিছু জায়গায় অবশ্যই পরমাণু বোমা ফেলত। পরবর্তী স্তরে রাশিয়ানরা হয়তো ইকোনমিক টার্গেটগুলোকে উড়িয়ে দিতো এবং তার সাথে অনেক মাত্রায় সাধারণ মানুষকে। ইউ কে এর জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মারা যেত এবং হয়তো এরপর পেন্টাগন তাদের নিজস্ব নিউক্লিয়ার যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী, 5,500 পরমাণু বোমা চিন সহ হাজার হাজার  লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করত।


কিন্তু এই ভয়ানক গায়ে কাঁটা লাগানো ঘটনাটি ঘটেনি এই মানুষটির জন্য। আর্কিপভ তাদের শান্ত করেন যে, তাদের জাহাজ কোন বিপদে নেই এবং যে বিস্ফোরণ-গুলি হচ্ছিল বা তাদের চার্জ করা হচ্ছিল সেগুলি তাদের লক্ষ্য করে না বরং তাদের আশেপাশে করা হচ্ছিল; যার অর্থ তাদের কেবলমাত্র সতর্ক করার উদ্দেশ্যে এগুলো করা হচ্ছে।


এদিকে প্রেসিডেন্ট কেনেডি খুব চিন্তিত ছিলেন যে রাশিয়ানরা এই ডেপ্থ চার্জকে আক্রমণ হিসেবে না ভেবে নেয়। তার ভাই এর মতে সেদিনকে যখন প্রেসিডেন্ট শুনেছিলেন, ডেপথ চার্জ করা হচ্ছে, তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে যান এবং তার হাত মুখের উপর চলে আসে এবং তার আরেকটি হাত মুঠো করা ছিল। কতক্ষণ আর্কিপভ এবং সভিৎস্কির মধ্যে তর্ক চলে তা জানা যায়নি। অনেকক্ষণ নিচে অপেক্ষা করার পর ফুয়েল এবং অক্সিজেন রিজার্ভ শেষ হয়ে আসছিল, এয়ারকন্ডিশনিং প্রায় কাজ করা বন্ধ করে ফেলেছিল ফলে ভিতরে গরম হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে সাবমেরিনটি সমুদ্রের উপর উঠে আসে। আর্কিপভ সঠিক ছিলেন, সাবমেরিনটি উপরে উঠে আসে এবং নিজেকে ইউএস ওয়ার্শিপগুলির এর মাঝে পায়। কিন্তু কোন যুদ্ধ শুরু হয়নি। আমেরিকানরা সাবমেরিন অবতরণ করেনি বা একে আটকানোরও  চেষ্টা করেনি কেবলমাত্র তাদেরকে রাশিয়ায় ফিরে যাওয়ার জন্য আদেশ করা হয়।


1975 সালে আর্কিপভ রিয়ার এডমিরাল পদে প্রমোশন পান এবং তিনি পরবর্তীকালে 'কিরভ নেভাল একাডেমির' প্রধান হন। এরপর 1981 সালে তিনি ভাইস অ্যাডমিরাল হন এবং রিটায়ার করেন। তিনি 1998 সালের 19 আগস্ট কিডনি ক্যান্সারে দেহত্যাগ করেন যার কারণ ছিল, 1961সালে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন এ একটি অ্যাক্সিডেন্ট যার ফলে তার শরীরে রেডিয়েশন সংস্পর্শ আসে।

আপনার কি মনে হয়? আজ আমরা যে পৃথিবীতে বেঁচে আছি, যে পৃথিবী দেখছি, রোজকার ভালো মন্দ কাজ, সমালোচনা করা সব কিছুতে এনার কি কোথাও একটা অবদান থাকতে পারে? আমরা এরম পরিস্থিতিতে কি করতাম?

Saturday, 11 July 2020

বাস্তব জীবনের নায়ক যারা পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন - পর্ব 1 --


যখন আপনারা পৃথিবীকে বাঁচানোর কথা ভাবেন তখন হয়তো আপনাদের মাথায় আসে শেষ মুহূর্তে সুপারম্যানের মতো সুপারন্যাচারাল কার্যকলাপ, বোম্ব স্কোয়াট শেষ মুহূর্তে কোন ভয়ানক ক্ষেপণাস্ত্র বা যন্ত্রাংশ নিষ্ক্রিয় করছে অথবা বৈজ্ঞানিকরা শেষ মুহূর্তে ভিনগ্রহীদের বিরুদ্ধে কোনো অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু আসল জীবনে যারা পৃথিবীতে বাঁচিয়েছেন তাদের ঘটনাগুলিও কম রোমাঞ্চকর নয়। 

যেখানে সুপারহিরোরা শেষ মুহূর্তে তাদের নায়কোচিত ঘটনা ঘটিয়ে পৃথিবীকে বাঁচিয়ে দেয় সেখানে মানবজাতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে  সাধারণত কোন বিপর্যয় থেকে বেঁচেছে, বিপদের মুখে তাদের ধৈর্য্য এবং ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে।
অনেক নায়ক বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের কাজ করে গেছে, অনেকে তাদের অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রমের ফলাফলস্বরূপ এই কাজ করতে পেরেছে ; আবার কোন কোন নায়ক তারা ভবিষ্যতের জন্য কি করেছে অথবা তাদের কিভাবে মনে রাখা হবে ইত্যাদি না চিন্তা করেই এই কার্যে মৃত্যু বরণ করেছেন। 

স্তানিস্লাভ পেত্রোভ 

প্রথম পর্বে এরকম এক বাস্তব জীবনের নায়ক স্তানিস্লাভ পেত্রভ কে নিয়ে আলোচনা করব। 
26 সেপ্টেম্বর 1983 সালে বাস্তব জীবনের নায়ক স্তানিস্লাভ পেত্রভ তার অন্তরের কথা শুনে পৃথিবীতে পরমাণু যুদ্ধের সূচনা হওয়া থেকে একাই বাঁচিয়েছিলেন। 

এইসময় পেত্রভ মস্কোর বাইরে একটি গোপন কমান্ড সেন্টার যার নাম - 'সারপুকোভ 15' এ ডিউটি অফিসার হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি সেদিনকার শিফটের মাত্র কয়েক ঘন্টা পার করেছিলেন। এই কমান্ড সেন্টারের মাধ্যমে ইউনাইটেড স্টেটস এর উপর থাকা সোভিয়েত মিলিটারি স্যাটেলাইট গুলিকে দেখা হতো। হঠাৎ করে এখানে এলার্ম বাজতে শুরু করলো; এই এলার্ম এর অর্থ ছিল বিপদ সংকেত যার অর্থ একটি আমেরিকান বেস থেকে 'ফাইভ মিনিটম্যান ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল' উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।



পেত্রভ কিন্তু ঘাবড়ে যাননি তিনি জানতেন এই অ্যালার্ম সিস্টেমগুলি তাদের প্রাথমিক পর্যায় রয়েছে এবং ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই ওয়ার্নিংটি ভুল বা ফলস হতে পারে। যদিও পরবর্তীকালে তিনি বলে থাকেন যে, এটি আসলে 50-50 সম্ভাবনা হতে পারে যে এটি ভুল নয়। মিসাইলের আক্রমণ রিপোর্ট না করে পেত্রভ এলার্ম বন্ধ করে দেন এবং তার উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে জানান যে একটি যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছে। 

শেষ পর্যন্ত পেত্রভ সঠিক ছিলেন; এই মিসাইল অ্যাটাক অ্যালার্ম সিগন্যালটি ভুল ছিল। যদি পেত্রভ আক্রমণটিকে বাস্তবে রিপোর্ট করতেন তবে, বিশ্ব জুড়ে পরমাণু যুদ্ধের সূচনা হতে পারতো। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় থেকে সময় নিয়ে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে পেত্রভ পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন। 

পরবর্তীকালে 'ওয়াশিংটন পোস্ট'কে  তিনি বলেছিলেন, "আমার ভিতর কেন জানি একটি মজাদার অনুভূতি হচ্ছিল, আমি কোন ভুল করতে চাইনি। আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং সেটি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। "

ঠান্ডা মাথায় এবং দ্রুত চিন্তা করা তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। যখন তিনি বিষয়টি নিয়ে বিবেচনা করছিলেন তিনি স্থির করেন যে, যদি আমেরিকানরা সত্যি যুদ্ধ শুরু করে তবে সেই আক্রমণটি আরো বৃহৎ এবং তীব্রতর হওয়া উচিত। তিনি বলেছিলেন, "যখন কেউ একটি যুদ্ধ শুরু করে সে মাত্র পাঁচ খানা মিসাইল দিয়ে নিশ্চয়ই যুদ্ধ শুরু করবে না।"

আপনার কি মনে হয়? আজ আমরা যে পৃথিবীতে বেঁচে আছি, যে পৃথিবী দেখছি, রোজকার ভালো মন্দ কাজ, সমালোচনা করা সব কিছুতে এনার কি কোথাও একটা অবদান থাকতে পারে? আমরা এরম পরিস্থিতিতে কি করতাম?

Wednesday, 27 May 2020

চেঙ্গিস খানের আক্রোশ -- একটি কিংবদন্তি ঐতিহাসিক প্রতিশোধের কাহিনী --


খারেজমীন সাম্রাজ্যর কথা হয়তো আপনি শোনেননি এটা অসম্ভব নয় কারণ চেঙ্গিস খান এর প্রতিশোধ এতটাই ভয়ানক ছিল।

1205 সালে নাঈমানের যুবরাজ কুচলাগ মঙ্গোলিয়া থেকে পালিয়ে যায় যখন চেঙ্গিস খান এবং তার মঙ্গল সাম্রাজ্য তাদের এলাকা দখল করে। 1208 সালে চেঙ্গিস খান কুশলগকে পরাজিত করেন এবং কুচলাগ আরো পশ্চিমে চলে যায় এবং সেখানে ঝিলুগু সাম্রাজ্যে রাজ কন্যাকে বিবাহ করেন। 

পরবর্তীকালে নিজের শ্বশুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সৃষ্টি করে তিনি পশ্চিম লিয়াও সাম্রাজ্যের দখল নেন।  1216 সালে কুচলাগ বাসবালিক শহরে আক্রমণ করে, যেটা তখন মঙ্গল সাম্রাজ্যের আশ্রয় ছিল। তাই চেঙ্গিস খান তার অন্যতম পারদর্শী সেনাপতি জেবেকে সেখানে পাঠান এবং দুই বছরের মাথায় পুরো পশ্চিম অংশটি তার দখলে চলে আসে এবং মোঙ্গল সাম্রাজ্য খারেজমী সাম্রাজ্যের পর্যন্ত বিস্তার করে যায়। এই সাম্রাজ্যঃ খারেজমনের শাহ মোহাম্মদ ২ এর শাসনে ছিল। চেঙ্গিস খান তার ব্যবসায়ীদের সেখানে পাঠান খারেজমানদের সাথে ব্যবসা শুরু করার জন্য কিন্তু  অট্রার গভর্নর ইনালচুক এই ব্যবসায়ীদের গুপ্তচর বদনাম করে কারাগারে বন্দি করে রাখেন। বেশিরভাগ মানুষ তখনকার দিনে, পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত এই সাম্রাজ্য বিস্তারকারী ব্যক্তির সাথে সীমানা ভাগ করা ভালো বিষয় করতেন না,  তাই যখন চেঙ্গিস খান  500 মানুষের একটি দলকে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে তার এই নতুন প্রতিবেশীর কাছে পাঠালেন তখন খারেজমী শাহের মনে সন্দেহ হয়েছিল। যদিও বেশিরভাগ ইতিহাসবিদদের মতে, চেঙ্গিস খানের এই সাম্রাজ্য দখলের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না।

এরপরেও আক্রমণ না করে বা হুমকি না দিয়ে চেঙ্গিস খান সেখানে তার 3 জন প্রতিনিধি পাঠান; যার মধ্যে দুজন মঙ্গল ও একজন মুসলিম ছিল তারা এই 500 জন মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য কথাবার্তা শুরু করেন। কিন্তু তবুও শাহ বদলাননি; তিনি দুইজন মঙ্গলের মাথা মুড়িয়ে দেন এবং মুসলিম দূতের মাথা কেটে ফেলেন। এছাড়া তিনি বন্দী থাকা 500 জন ব্যবসায়ীকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করেন।

চেঙ্গিস খান অতিথি পরায়ণ নিয়ে এক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি তাদের এই অনৈতিক কাজে ক্রোধিত হয়ে পড়েন, তাই তারপর তিনি সিল্ক রোড থেকে তার শত্রুদের সম্পর্কে সকল তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তিনি চীন থেকে এলাকা দখল করা বিষয়ে পারদর্শী  ও অভিজ্ঞ একটি দল গঠন করে নিয়ে আসেন এবং খারেজমী সাম্রাজ্যঃ দখলের জন্য তার সেনাবাহিনীকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন। মঙ্গোলিয়ানদের কাছে এক লাখের উপর সৈন্য ছিল।
.
1219 সালের শীতের সময় তিনি যোশি এবং যেবেকে ফার্ঘানা প্রদেশ লুটপাটের জন্য জন্য 20,000 সেনাসমেত পাঠান।

খারেজমিয়ান সৈন্যরা ভেবেছিল যে এই আক্রমণকারী দলটি মূল শক্তি ছিল কিন্তু অন্য দিক থেকে চাগাতাই খান এবং ওগেদাই খান যুগারিয়ান গেট দিয়ে ঢুকে অত্রারের 20,000 জন এর শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে আটক করে ফেলে। এর পাঁচ মাস বাদে এক পলাতক শহরের দরজা খুলে দিয়ে মোঙ্গলদের শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে; তারপর এখানে মানুষদের বন্দী করা থেকে শুরু করে গণহত্যা শুরু হয়ে যায় এবং শহরটি মাটিতে মিশে যায়। ইনালচুকের চোখে এবং কান দিয়ে গলিত রুপো ঢেলে হত্যা করা হয়।

এরপর চেঙ্গিস খান এবং তার সৈন্যরা দুর্গম কিজিলকুম মরুভূমি অতিক্রম করে এবং বুখারা দখল করে নেয়। এখানকার রক্ষীরা যুদ্ধ ও গণহত্যা শুরু হওয়ার আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। চেঙ্গিস খান খারেজমী সাম্রাজ্যের রাজধানী সামারকান্দ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। 1220 সালে এই শহরের 40,000 জনের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীকে ঘিরে ফেলেন। এরপর তৃতীয় দিনে যখন সেই বাহিনী আক্রমণ শুরু করে, তখন চেঙ্গিস খান একটি ছলনা পূর্বক পলায়ন করেন এবং এই বাহিনীকে প্রলুব্ধ করে বাইরে বের করে আনেন ও  প্রায় অর্ধেক সংখ্যক বাহিনীকে হত্যা করা হয়। তাদের দুটি সাহায্যের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পঞ্চম দিনে বেঁচে থাকা কিছু হাতেগোনা সৈনিক আত্মসমর্পণ করে; এরপর এক লাখ জনসংখ্যা বিশিষ্ট শহরে বিপুল নরসংহার  শুরু হয়ে যায়। শাহ এবং তার পুত্র উত্তর-পশ্চিম দিকে পালিয়ে যায় এবং চেঙ্গিস খান সেনাপতি সবেতেই এবং জেবেকে  20,000 সৈন সহকারে তার উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেন।  এদিকে সামারকান্দ ধ্বংস করার পর উর্গেস কে ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং খোরাসান, রেজিন, বালক, মারভ নিশাপুরে - তারা পরপর সাফল্য পেতে থাকে; এদিকে হেরাত এবং অন্যান্য শহর যারা শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। নিজেদের কার্যসিদ্ধির জন্য এবং এইসব শাসকদের শাসনের বিরুদ্ধে মঙ্গোলরা একটি দক্ষ নিষ্ঠুরতার পরিকল্পনা ব্যবহার করেছিল।

এদিকে মহম্মদ এর পুত্র জালালউদ্দিন মিংবুমু প্রায় 60,000 জন তুর্কি এবং আফগানি যোদ্ধাদের দলকে নিযুক্ত করেন। ফলে চেঙ্গিস খান সেনাপতি শিকিখতুক কে 30,000 জন সৈনিকের নেতৃত্বে জালালুদ্দিন এর উদ্দেশ্যে কাবুলের উত্তরে পাঠান।
এটি নিশ্চিত যুদ্ধপরিস্থিতিতে একটি সরু খাতের মাঝে দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি হয়। যে স্থানটি মঙ্গলিয়ান সেনাবাহিনীর পক্ষে অনুপযুক্ত ছিল।  ফলে মঙ্গল সেনাবাহিনী একটি লজ্জাজনক হারের সম্মুখীন হয় এবং যখন তারা পিছু হটতে থাকে। তখন জালালউদ্দিন তার সৈন্যদের পুনরায় আক্রমণে পাঠায়, ফলে এই বাকি সেনাবাহিনীর অর্ধেক জন হারিয়ে যায় এবং বাকি অর্ধেক পালাতে সক্ষম হয়। এই পরাজয় মঙ্গল বাহিনীর অপরাজেয় তকমাটি ভেঙে দেয়।

এরপর খারেজমী সাম্রাজ্যের জন্য মধ্য এশিয়ায় বিদ্রোহের সূচনা হয় যদিও জালালউদ্দিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে পরবর্তী কয়েক মাসে একটি অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং জালাল উদ্দিন ভারতবর্ষে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পালিয়ে আসে; কিন্তু জালালউদ্দিনেই বাহিনী ইন্ডাস নদী পেরোনোর  আগে চেঙ্গিস খান তাদের ধরে ফেলে ফেলতে সক্ষম হয় এবং মঙ্গল বাহিনী তাদের সেনাবাহিনীকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়। 
এরপর 20,000 জনের মোঙ্গলবাহিনী যুবরাজকে ধরে আনার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় কিন্তু তাকে আর  খুঁজে পাওয়া যায়নি। খারেজমিনের বেশিরভাগ অংশ দখলে চলে যায় এবং শাহ তার বাকি জীবন ক্যাস্পিয়ান সমুদ্রের একটি দ্বীপে নির্বাসনে কাটাতে কাটাতে দেহত্যাগ করেন। এদিকে মোঙ্গলরা মধ্য এশিয়ার জনসংখ্যা দুই মিলিয়ন থেকে 2 লাখে কমিয়ে আনে এবং তারা অন্যান্য সম্রাজ্য দখল করার জন্য মনোনিবেশ করে।

এদিকে ইন্ডাস নদীর তীরে যুদ্ধের পরে জালালউদ্দিন তিন মাস পাঞ্জাবে কাটান, তার শক্তি সঞ্চয় এবং হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন এলাকা দখল করার উদ্দেশ্যে তিনি মামেলুক এর সুলতান ইলতুৎমিশের সাথে সন্ধি করার চেষ্টা করেন কিন্তু  ইলতুৎমিস চেঙ্গিস খানের বিরুদ্ধে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বরঞ্চ 1224 সালে সুলতান জালালউদ্দিনকে আক্রমণ করে এবং তাকে লাহোর ত্যাগ করতে বাধ্য করে।  যেহেতু জালাল উদ্দিনের পিতা অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছিল তাই জালালুদ্দিন খারেজমিন সাম্রাজ্যের মুকুট সহজেই পুনরাধিকার করে নেন।  তিনি আজারবাইজান দখল করেন এবং তার রাজধানী তব্রিজ এ নিয়ে যান।  এরপর তিনি জর্জিয়া দখল করেন এবং বিলিসি নামে একটি বড় শহরের দখল করে সেখানকার খ্রিস্টান এবং মুসলিম উভয় বাসিন্দার গণহত্যা করেন।

এরপর মঙ্গল 1227 সালে একটি ছোট বাহিনী ইরানে পাঠায় কিন্তু জালালউদ্দিন এদেরকে পরাজিত করে। কায়াওয়াবাদ, আয়ুবিদের সুলতান এবং আর্মেনিয়ার রাজা জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে একত্রিত হয় এবং 1228 সালে তাকে ইরাভানে পরাজিত করে।  এরপর তার সাম্রাজ্যঃ জুড়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ সূত্রপাত হয়।

অবশেষে চেঙ্গিস খানের পুত্র অগেদেই খান তার চর্মাকান নামক সেনাপতিকে ইরান পুনর্দখলের জন্য পাঠান এবং সেখানে সেন্ট্রাল ইরানে 1231 সালে জালালউদ্দিন পরাজিত হয়ে তুর্কিতে পালিয়ে যায়। যেখানে তাকে হত্যা করা হয় এবং খারেজমী সাম্রাজ্যের অবশেষে সমাপ্তি ঘটে এরপর জর্জিয়া ও অন্যান্য দেশগুলি মঙ্গলের ছত্রছায়ায় চলে আসে। 

Monday, 30 March 2020

সিনেমা নয়, বাস্তবের উন্মাদ নাৎসি বৈজ্ঞানিক এবং আর্জেন্টিনায় তার তৈরী দুর্গম দ্বীপ-

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যা পৃথিবীজুড়ে বহু ক্ষয়ক্ষতি এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল, সেই  যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে আর্জেন্টিনা দেশটি স্বাধীনতার সাথে সাথে শিল্প এবং অর্থনীতির বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল, লক্ষ ছিল পৃথিবীর শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

তৎকালীন স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি যুয়ান পেরণ যুদ্ধের পর চারিদিকে ছড়িয়ে যাওয়া বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে এমন কয়েকজন কে খুঁজছিলেন যারা নতুন প্রজেক্ট এর সন্ধানে আছে যা দেশকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে এবং যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক অস্ট্রিয়ান এবং জার্মান বৈজ্ঞানিক আর্জেন্টিনায় ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য এলাকায় সবার আড়ালে এসে আত্মগোপন করেছিল। এদের মধ্যে অ্যাডলফ ইচমান ও জোসেফ মেঙ্গেলের মতো বড় বড় নাৎসী নামও ছিল।
এরকম সব দজ্জাল বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে একজন ছিল চেকোস্লোভাকিয়া জন্মানো অস্ট্রিয়ান বৈজ্ঞানিক রোনাল্ড রিখটার। তিনি প্রথম দাবি করেন যে তিনি নিউক্লিয়ার ফিউশন এনার্জি রহস্য ভেদ করতে পেরেছেন যার ফলে খুব সুলভে অসীমিত পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা যাবে এবং এরপর তিনি নাৎসিদের পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটর ডেভেলপ করতে সাহায্য করেছিলেন।

এইভাবে ঘটনাটি সূত্রপাত হয় যাতে আমাদের কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রে দেখা পাগল বৈজ্ঞানিক এবং তার পরীক্ষাগার ও খলনায়ক এর মত বিভিন্ন ভয়ানক স্তরে ঘেরা দ্বীপপুঞ্জ সবই ছিল।

রিখটার ইউরোপ থেকে নকল পাসপোর্টে আর্জেন্টিনায় একদল অন্যান্য জার্মান বৈজ্ঞানিক এবং ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে পালিয়ে এসেছিল। তাদেরকে আর্জেন্টিনার সরকার বিনা বাধায় সক্রিয়ভাবে স্বাগত জানিয়েছিল এবং সরকার থেকে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা জিনিসপত্র এবং স্থান দেওয়া হয়েছিল যাতে আর্জেন্টিনার উন্নতি হয়। রিখটার ডক্টর পেদ্রো মাতিস এর সঙ্গে করে তার নিউক্লিয়ার ফিউশনের স্বপ্নটি আবার তুলে ধরেন, যেটা তখনও তারা সম্পাদন করতে পারেনি। সেই সময়ই তিনি জার্মান এরোনোটিকাল ইঞ্জিনিয়ার কুর্ত ট্যাংক কে নিয়ে আসেন যিনি নাৎসিদের আকাশযানগুলি তৈরি করতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন। 
জুয়ান পেরোন 

 মিটিং এর সময় রিখটার খুব উৎসাহ সহকারে তার বিস্ময়কর আবিষ্কারের বর্ণনা করেন যা খুবই সুলভে অসীম শক্তির যোগান দেবে এবং এর জন্য ইউরেনিয়াম এর দরকার পড়বে না কেবলমাত্র কিছু খুবই প্রাথমিক এবং সহজলভ্য বস্তু যেমন হাইড্রোজেন, লিথিয়াম, বেরিয়াম ইত্যাদি দিয়ে শুরু করা যাবে। যতক্ষণে রিখটার তার বক্তৃতা সম্পন্ন করেছিল ততক্ষনে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট রাজি হয়ে গিয়েছিল। এমনকি রিখটারের কথাগুলোর সেরকম ভিত না থাকলেও তার দাবি ও বিশ্বাস এত জোরালো ছিল যে আর্জেন্টিনা সরকার তাকে পুরোপুরিভাবে সবকিছুর বন্দোবস্ত করে দিল। 1949 সালে তাকে সানকারলোস -দে-বারি  লোচের কাছে ভুয়াভিলেক এর মধ্যে অবস্থিত প্রত্যন্ত স্থানে হিউমুল নামে একটি গোটা দ্বীপ দিয়ে দেওয়া হলো যাতে সে 'থারমো ট্রন' নামক তার ফিউশন যন্ত্র তৈরি করতে যা কিছু চায় করতে পারবে।

এইভাবে প্রজেক্ট হিমুল শুরু হয় যাতে সরকার প্রচুর অর্থ যোগান দিতে থাকে যাতে কোন খরচ বাকি থেকে যায় না। একটি আঁকাবাঁকা ভাবে বিশাল এলাকা নিয়ে তৈরি প্রাঙ্গণ যাতে বিশাল কংক্রিটের তৈরি 40 ফুট উঁচু বাঙ্কার এবং তার সাথে অনেকগুলি রিয়াক্টর তৈরি করা হলো যার খরচ প্রায় 300 মিলিয়ন ডলার ছিল। এর সাথে বহু পালিয়ে আসা বৈজ্ঞানিক কে কাজে রাখা হল এবং গবেষণাটি কে আরো কার্যকর করে তুলতে বহুমূল্য যন্ত্রপাতি কেনা হল।  যেমন- একটি 'ফুল-ব্লোন পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটর' যা সেই সময় পুরো দক্ষিণ আমেরিকায় মাত্র একটি ছিল।
এই গোপন গবেষণাগারের সবকিছু পাহারা দেওয়ার জন্য এক ধরনের বাহিনী থাকতো যারা অনেকটা জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের মতোই ছিল। 1951 সালের মধ্যে গবেষণাগার তৈরি হয়ে যায় এবং বাইরের পৃথিবী অগোচরে দ্বীপের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে বৈজ্ঞানিকরা তাদের কাজ শুরু করে দিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত একটি ছোটখাটো সূর্য তৈরি করা যেটি সহজলভ্য ও অসীমিত শক্তির যোগান দেবে এবং যা পৃথিবীর সকল পদার্থবিদের স্বপ্ন ছিল। একটা এমন সময় ছিল যখন প্রোজেক্টের মাঝে তারা খুঁজে পেল  রিঅ্যাক্টরের নকশাতে কিছু গলদ আছে যার ফলে সেটি ছিড়ে আবার নতুন করে শুরু করতে বাধ্য হতে হয় এবং পুরো প্রজেক্টটা একটা পয়সার ব্ল্যাক হোলে এসে দাঁড়ায়; কিন্তু কোন স্পষ্ট সাফল্যের ইঙ্গিত না থাকা সত্ত্বেও পয়সার যোগান বন্ধ থাকেনি।
রিখটার ও পেদ্রো মাতিস 

এতকিছু সামগ্রী এবং পয়সা প্রজেক্ট এর পেছনে লাগলেও ভবিষ্যৎ ধোঁয়াশা ছিল কিন্তু তবুও রিখটার সাফল্য সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিল যদিও সে কিভাবে এগুলি কাজ করবে তাও পর্যন্ত তখনও বলেনি এবং বৈজ্ঞানিকজগৎ ধীরে ধীরে তার থেকে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেছিল। বাইরের জগত থেকে ঘটনাটির তদন্ত করার জন্য অনেক সাংবাদিক এবং মানুষদের পাঠানো হয়েছিল কিন্তু রিখটারের গুন্ডা বাহিনীর কাছে সকলে ব্যর্থ হয়ে যায়। কোন তথ্য পাওয়া যায়নি যে তারা সেই দ্বীপে কি করছিল এবং বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিক সমাজ ভ্রুকুটি তুলে চেয়েছিল। এই ব্যয়বহুল প্রোজেক্টের তিন বছরের মাথায় প্রথম  রিখটার সামনে এসে সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করে যে সবাই যার পেছনে প্রচুর টাকা ও সময় ব্যয় করে অপেক্ষা করছিল সেই ফলাফল এসেছে তিনি ঘোষণা করলেন মূল ফিউশন সম্পন্ন করা গেছে। রিক্সার যথেষ্ট জয়ী ভঙ্গিমায় বিশ্বের সম্মুখে ঘোষণা দিল যে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে এবং সেইদিন খুব শিগগিরই আসবে যখন পারমাণবিক এই শক্তিকে বা এনার্জি কে দুধের বোতল এর মত ছোট প্যাকেটে বিক্রি করা যাবে। এই খবরটি বিশ্বের চারিদিকে খবরের শিরোনামে এসে গেল এবং অনেকেই আশান্বিত হল যে সকলের কাছে ভবিষ্যতে এই স্বল্পমূল্যে পারমাণবিক শক্তি একদিন পৌঁছে যাবে। যদিও এই ঘোষণা সন্দেহজনক হিসাবে অনেক ভ্রুকুটির  সম্মুখীন হয়েছিল। গবেষণার কিছু যন্ত্রপাতি দেখে বোঝা যায় এবং সেখানকার কোন এক প্রযুক্তিবিদ গোপনে দাবি করেন যে এই গবেষণা কেবলমাত্র থেমে গেছে এক্সপেরিমেন্ট করার সময় একটি ত্রুটির কারণে এবং এটাও ঠিক ছিল যে রিকটার আবার নতুন করে গবেষণাটি শুরু করতে অনুমতি দেবে না অথবা কারোর সাহায্য নেবে না আবার এই আবিষ্কারটি সে খুব গোপনে করেছিল, ফলে  অন্য কেউ এ নিয়ে সাহায্য করতে পারতো না। এতকিছুর পর রিখটার পুরনো রিয়াক্টর কে খুলে তার জায়গায় নতুন করে আরও উন্নত মানের রিয়াক্টর তৈরি করার আদেশ দেন যাতে সেই ত্রুটিটি আর না হয়। দুর্ভাগ্যবশত রাষ্ট্রপতি জুয়ান প্রেরণের সন্দেহ বেড়ে যায় এবং তিনি তদন্ত করার জন্য তার নিজস্ব বাহিনী পাঠান যারা দাবি করে যে তারা পারমাণবিক ফিউশন সম্পন্ন করার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ খুঁজে পায়নি। বরঞ্চ তারা কিছু সূত্র খুঁজে পায় যাতে জানা যায় রিখটার তার পরীক্ষার ফলাফল কে অতিরঞ্জিত করার জন্য এলাকার আশেপাশে লাউড স্পিকার লাগায় একাউষ্টিক ওয়েভের সৃষ্টি করে ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। এবং দেখা যায় অনেক যন্ত্রপাতি একে অপরের সাথে ঠিকমত যুক্ত করা ছিল না যা দেখে বোঝা যায় এটা পারতপক্ষে জালিয়াতি ছিল।
আর্জেন্টিনা সরকারের কাছে এটা যথেষ্ট ছিল প্রজেক্টর বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এবং 1952 সালে সব বন্ধ করে দেওয়া হয়।
রিখটার কে গ্রেফতার করা হয় এবং কংগ্রেসের থেকে তার উপর বিভিন্ন মামলা করা হয়, এদিকে স্বৈরাচারী প্রেরণ কেও 1955 সালে গদিচ্যুত করা হয়। এই জালিয়াতির পরেও এর পাশাপাশি অনেকগুলি ফিউশন রিক্টর প্রজেক্ট শুরু করা হয় এমনকি এই প্রজেক্ট এর পরিমাণ বেড়ে যায় এই সময়।
আমরা এখনো নিউক্লিয়ার ফিউশান পেয়ে উঠতে পারিনি এবং এটা সেই কল্পনা কারি শক্তি উৎপাদন থেকে গেছে যা আগেও ছিল।

এখনো শিমুল দ্বীপে সেই প্রয়োগ শালার অবশিষ্ট গুলি রয়ে গেছে এবং সেখানে ঘোরার জন্য এবং ইতিহাসের সর্ব বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জালিয়াতি দেখার জন্য বোট ভাড়ায় দেওয়া হয়। অনেকেই ভাবতে থাকবে রিক্তার কোন উন্মাদ ছিল, বুজরুক ছিল জালিয়াত শিল্পী ছিল নাকি সে সত্যিকারেরই কোন কিছুর পিছনে এগিয়ে চলেছিল। সেকি ফগ জোচ্চোর ছিল নাকি লোকে তার প্রতিভা না বুঝতে পেরে ভুল বুঝে তাকে বন্ধ করে দিয়েছিল? পদার্থবিদ এডওয়ার্ড টেলার খুব সুন্দরভাবে রিখটার সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেছিলেন কেউ যদি রিখটারের লেখা একটি লাইন পড়ে সে বুঝতে পারবে সে প্রতিভাবান ছিল। পরের লাইন পড়লে সে মনে করবে রিখটার পাগল ছিল। রিখটারের হাতে সত্যিই কিছু ছিল কি ছিল না তবুও তার এবং দ্বীপের জঙ্গলে তার ভয়ঙ্কর দুর্গের কথা ইতিহাসের অস্বাভাবিক ঘটনা গুলির মধ্যে উল্লেখিত হয়ে থাকবে।

Sunday, 22 September 2019

জানা - অজানা জাপান --

শিন্টোইসম ও বুধ্ধিসম --

এই দুই ধর্ম জাপানের সবচেয়ে পরিচিত ধর্ম। একজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত জাপানিজ প্রোফেসর জাপানের বাসিন্দাদের উপর করা সমীক্ষায় প্রকাশ করেন যে জাপানের ৮০% হলো শিন্টোইস্ট এবং ৭০% হলো বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী। যা মিলিয়ে ১৫০% হয়। কিন্তু কিভাবে? খুব সহজ. একজন জাপানিজ বলতে পারেন যে তিনি বৌদ্ধ ও শিন্টোইস্ট দুই ই। জাপানে এই দুই ধর্ম পালন খুব ই সাধারণ ব্যাপার। 

"karaoke" বা কারোকে --

এশিয়ান দেশগুলিতে বিশেষ করে আমাদের দেশে "karaoke" বা কারোকে গায়করা খুব জনপ্রিয় কিন্তু এই শব্দটি আসলে জাপানি শব্দ 'কারা ' যার অর্থ খালি ও 'ওকে ' যার অর্থ অর্কেস্ট্রা একসাথে করলে মানে বোঝায় রেকর্ড করা মিউজিক বা ছন্দের সাথে গান গাওয়া বা কণ্ঠ দেয়া।

ইকেবানা --
জাপানিজ ফুল সাজানোর একটি শিল্প হলো ইকেবানা। অন্য কোনো দেশে এই ফুল সাজানোকে শিল্প হিসাবে দেখা হয়না  কিন্তু জাপানে এটি বেশিরভাগ বাসিন্দা মেনে চলে।  ইকেবানা কেবল পাত্রে ফুল গুছিয়ে রাখার থেকে অনেক বেশি কিছু। ফুল সাজানোর বিভিন্ন পদ্ধতি আছে প্রতিটি ধাপে ধাপে যা আমাদের প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক ও মূল্য ব্যক্ত করে এবং জাপানিজরা একে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

ওয়াসকু --

ঐতিহ্যবাহি জাপানিজ খাদ্যগুলিকে ওয়াসকু বলে যার অর্থ 'জাপানের খাবার'  এগুলি  স্বাস্থকর ও সুস্বাদু হিসাবে পৃথিবী খ্যাত ও 'ইউনেস্কো কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি' হিসাবে সীকৃতি পেয়েছে। এগুলি থেকে আমাদের দেশে 'ইনস্ট্যান্ট নুড্ল ' এর আমদানি হয়।

অটোমোবাইল --

ইয়ামাহা , টয়োটা , ইসুজু,হোন্ডা ,কাওয়াসাকি,সুজুকি, মাজদা, এগুলি বিখ্যাত গাড়ি নির্মাণ সংস্থা যা সারা বিশ্বে বিখ্যাত। গত ১০ বছরে জাপানের গাড়ি নির্মাণ প্রায় ১০ গুন্ বেড়েছে।

শিশুদের থেকে বৃদ্ধ বেশি --

জাপান সম্পর্কে একটি দুক্ষজনক তথ্য হলো এখানে শিশুর জন্ম নিয়ে খুব সমস্যা। এখানকার বর্তমান বাসিন্দাদের কাছে পরিবারের জন্য সময় নেই।  তাই বর্তমানে শিশুদের থেকে বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি।
এবং অবাক করা বিষয় শিশুদের থেকে বৃদ্ধদের ডাইপার বেশি বিক্রি হয়।
জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে পৃথিবীর সবচে বেশি আয়ুসম্পন্ন মানুষরা থাকে যার মধ্যে দুজন ১১৭ ও ১১৬ বছর বয়সী।

পৃথিবীর সবচেয়ে কম অপরাধের ঘটনা --

জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান আপনার যদি অপরাধ জগতে ভয় থাকে তবে আপনি জাপানে চলে আসুন।  এখানে কিছু সবচেয়ে বেশি ঘটা অপরাধের মধ্যে হোলো - সাইকেল বা ছাতা চুরি।
অনেকসময় ই এখানে লোকেদের ব্যাগ খোলা রেখে যাতায়ত করতে দেখবেন বা তাদের ঘরে তালা দেয়ার বা সাইকেলে তালা দিতে দেখা যায়না - জাপান এতটাই নিরাপদ।


-- আপনি নিশ্চই জানেন জাপান একটি দ্বীপকেন্দ্রিক দেশ কিন্তু জানেন জাপানে প্রায় ৬৮০০ এর বেশি দ্বীপ আছে ? সবচেয়ে বড়ো চারটি দ্বীপ হলো হোনশু , কিউশু , হক্কাইডো এবং শিকোকু যা মিলিয়ে জাপানের মোট ভূমির প্রায় ৯৭%!

--পরিষ্কার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয় --

আইন- কানুন জাপানে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং শিশু বয়সের থেকেই এগুলি বাধ্যতামূলক ভাবে শিশুদের সেখান হয়। এই জন্য বেশিরভাগ জাপানি বিদ্যালয়ে শিশুদের বা শিক্ষার্থীদের ই   ক্লাসরুম, টয়লেট এবং বিদ্যালয়ের আশেপাশে পরিষ্কার করতে হয় নিয়মিত ভাবে।  এভাবে সাফাইকর্মীদের পয়সা দিতে হয়না ফলে খরচ কমে যায় এবং এই পরিষ্কার করার উপর মূল্যায়ন বা নম্বর ও আছে।

এগুলো আমাদের দেশে ভাবতে পারবেন ? এইজন্য আমি এটাকে জাপানের সবচে অবাক করা তথ্য মনে করি।


--- জুতো খুলে রাখা --
অবশ্যই জাপানের সবজায়গাতে বলছিনা তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ করে ঘরে ঢোকার আগে , 'তাতামি' নামক মাদুর বা ম্যাট দেখলে সেখানে জুতো খুলে রাখতে হয়।

-- ঝুকে অভিবাদন জানানো --

 জাপানে অনেক রকমের ঝুকে অভ্যর্থনা বা অভিবাদন বা ক্ষমাপ্রার্থনা জানানোর পদ্ধতি আছে এক একটি এক এক রকমের পরিস্থিতির উপর করা হয় - তবে জাপানিজরা বোঝে যে কোনো বিদেশিদের পক্ষে এগুলি সঠিক ভাবে করা সম্ভব নয় , মাথা থেকে কোমর অবধি প্রতিটি ঝোঁকে এক এক রকম অর্থ আছে , তবে যাই হোক কাউকে অভিবাদন করতে বা অভ্যর্থনা করতে অন্তত ঝুকে সম্মান দেখানো উচিত। সাধরণত যতটা বেশি সময় নিয়ে ও নিচু হয়ে ঝোকা হয় তত বেশি সম্মান প্রদান করা হয় ধরতে পারেন তবে এর জন্য বেশিবেশি প্রত্যেকবার ঝুকে পড়বেন না এতে আবার আলাদা ব্যাপার হতে পারে !

বখশিস বা টিপ্ --
অন্যান্য দেশের হোটেলের মতো জাপানের ট্রেডিশনাল বা গতানুগতিক হোটেল বা রেস্টুরেন্টে গুলিতে টিপ্ বা বখশিশ নেয়ার প্রচলন নেই।


--- সুরুৎ সুরুৎ করে নুডুল খেতে জাপানে কোনো লজ্জা নেই বরং একে খুব ভালো চোখে দেখা হয় যার অর্থ আপনার  নুডুলসটি খুব ভালো লাগছে এবং জাপানি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে দেখবেন যে আপনার  বাইরে সবাই কত জোরে জোরে সুরুৎ সুরুৎ আওয়াজ করে নুডুলস খাচ্ছে।


-- গাড়ির দরজা জোরে বন্ধকরা অভ্যাস ? জাপানে একটু খেয়াল রাখবেন।
আপনি অবাক হয়ে যাবেন যে এখানে গাড়ি বা ট্যাক্সির দরজা গুলি নিজে থেকে বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা আছে  এবং জোরে বন্ধ করা থেকে সাবধান থাকবেন , আমি একবার ভুল করে অভ্যাসের বসে বন্ধ করে দিয়েছিলাম, যার ফলে ড্রাইভারটি খুব ভয় পেয়ে গেছিলো।


--- জাপানে নিজের বিসনেস কার্ড সবসময় একটু ঝুকে ও দুই হাতে ধরে দিতে হয়।


--- চপস্টিক জাপানে খাবার খাওয়ার একটি অংশ তবে চপস্টিক দিয়ে খাবার ভেঙে বা চিরে না খেয়ে খাবার টি তুলে কামড়ে খাওয়া উচিত।  কারণ এর অর্থ অন্যরকম দাঁড়ায় যেমন ভাতের মধ্যে খাড়া ভাবে চপস্টিক দেয়া শেষকৃত্যের একটি প্রথা।


-- মদ্যপান --
জাপানে নিয়ম হচ্ছে পদ অনুসারে ড্রিংক অফার করা যিনি নিচের পদের কর্মী আগে এবং উপরের পদের কর্মী তারপরে ড্রিংক অফার করে তাই কারোর ড্রিংক এর অফার প্রত্যাখ্যান করা এখানে বেশ অপমানজনক আপনার মদ্যপানের অভ্যাস না থাকলে আস্তে আস্তে খাবেন।


--- মোবাইল ফোন --
জাপানের প্রায় সব মোবাইল এ খুব উন্নত প্রযুক্তির এবং আমাদের ছাড়ুন মার্কিন বা ইউরোপিয়ান দেশগুলির থেকেও অন্তত ৫ বছর এগিয়ে।  যদিও এখানে বাসে বা ট্রেনে ফোনে কথা বলা ভালো ভাবে দেখা হয় না. নিয়ম হচ্ছে মোবাইল সাইলেন্ট করে বাস বা ট্রেনে ওঠা যদি জরুরি দরকার হয় তবে যতটা সম্ভব কম শব্দ করে আস্তে কথা বলা যেতে পারে।



-- লাইন দেখলে ভাববেননা আমাদের দেশের মতো কিছু বিনামূল্যে বা কম দামে পাওয়া যাচ্ছে , আসলে জাপানিরা সব ক্ষেত্রেই খুব শৃঙ্খলাবদ্ধ তাই যদি 'বাকা গাইজিন' বা মূর্খ বিদেশী কথাটি না শুনতে চান তবে ধৈর্য ধরে লাইন এ থাকবেন আগে বাড়িয়ে এগিয়ে যাবেন না।

-- যদি দেখেন সুট - টাই পরে রাস্তায় কেউ ব্রিফকেসে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে তবে অবাক হবেননা হয়তো শেষ ট্রেন মিস করেছে, এটা জাপানে সাধারণ ব্যাপার।

-- সাক্ষরতার হার জাপানে সবচেয়ে বেশি - ১০০% ওখানে জুনিয়র থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। 


--- জাপানিজ মহিলাদের কালো দাঁত -
জাপানে প্রাচীন যুগ থেকে 'ওহাগুরো ' বা দাঁত কালো করা মহিলাদের মধ্যে প্রচলন ছিল। বিশেষ করে বিবাহিত মহিলাদের মধ্যে। এই প্রচলনের কারণে তাদের আরো আকর্ষণীয় করার সাথে দাঁতের সমস্যা ও ক্ষয় দূর করবে এমন ধারণা ছিল. অনেক রকম জিনিস যেমন আঠা , কালি ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। এই প্রথাকে ১৯ শতকে নিষিদ্ধ করা হয় , জাপানকে আরো উন্নত ও অন্যান্য দেশের কাছে এই সভ্যতাকে আকর্ষণীয় ও ভালো করে তোলার জন্য।


-- পশ্চিমা দেশগুলি তে অনেক সময় এ মানুষকে হাটতে হাটতে খাবার খেতে বা কোল্ডড্রিঙ্কস/কফি পান করতে দেখা যায় কিন্তু জাপানে হাটতে হাটতে খাওয়া কে খুব ই অভদ্র আচরণ ও নিচু মানসিকতা বা নিম্ন বর্গের আচরণ ধরা হয়। খুব দরকার হলে তারা ভেন্ডিং মেসিনের পাশে দাঁড়িয়ে খেয়ে নেয়.

---সুমো জাপানের জাতীয় খেলা হলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো বেসবল খেলা যা মেজি শাসনের সময় প্রচলিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈন্যদের প্রচুর মাত্রায় উপস্থিতির প্রভাবে।

-- চা জাপান সংস্কৃতির একটি অংশ যদিও এই দেশে  উচ্চ গুণসম্পন্ন জ্যামাইকান কফি খুব জনপ্রিয়। জামাইকার রপ্তানিকৃত 'ব্লু মাউন্টেন ' কফির প্রায় ৭০% জাপানে যায়।


-- জাপানি রেস্টুরেন্ট গুলো প্রায় এ ওশিবোরি নাম ভিজে তোয়ালে খদ্দের দের দেয় খাবার খাবার আগে যাতে তারা হাত মুছতে পারে।  তোয়ালে গরম না ঠান্ডা থাকবে এটা নির্ভর করে খাবার কোন সময় দেয়া হচ্ছে। খালি এটা দিয়ে মুখ মুছবেন না বা সারাক্ষন ব্যবহার করবেন না।

---- জাপানে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৫০০ এর বেশি ভূমিকম্প হয়ে থাকে।  সৌভাগ্যবশত বেশিরভাগই ছোটোখাটো কিন্তু প্রতি বছর কিছু বড়ো ভূমিকম্পও হয় যা ৮ রিখটার স্কেলের বেশি হয়ে থাকে।

---জাপানে অন্যান্য দেশের থেকে লোকে বেশিক্ষন ও বেশিদিন কাজ করে। তাই অনেক অফিসেই কর্মীদের জন্য কাজের মাঝে পাওয়ার ন্যাপ বা ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে। এখানে এটা খুব ই সাধারণ ব্যাপার।

--- জাপানে ফল কে খুব ভালো উপহার হিসাবে দেখা হয় '

--- বেশিরভাগ জাপানের মানুষদের কাজে যাওয়ার আগে রাঁন্নার সময় থাকে না।  তাই জাপানে বেশিরভাগ মানুষই রান্না খুব কম করে এবং বাইরে কিনে খায়। এটা খুব এ সাধারণ ব্যাপার।

--জাপানে ট্যাটু বা উল্কিকে খুব ই নোংরা ধরা হয় এবং সাজের জন্য নয় বরং অপরাধ ও গ্যাং এর সাথে সম্পর্কিত ভাবে দেখা হয়। এবং ট্যাটু নিয়ে আপনি সুইমিং পুলএ নামতে পারবেন না। কারণ এতে জল অপবিত্র হবে ধরা হয়। সৌভাগ্যবশত এখন চামড়ার রঙের একপ্রকার ব্যান্ড এড পাওয়া যায় যা দিয়ে ঢেকে স্নান করার ব্যাবস্থা আছে এবং এখন জাপান আস্তে আস্তে পাল্টাচ্ছে এবং বিদেশিদের কাছে আরো আকর্ষণীয় হওয়ার চেষ্টা করছে।

-- বাথরুমে ঢোকার আগে একধরণের স্লিপার এখানে পরে ঢোকার রেওয়াজ আছে।

--- রসায়নবিদ্যা , ওষুধ ও ফিজিক্স বিভাগে জাপানের ১৮ জন নোবেল পুরস্কার প্রাপক আছে..

--জাপানিজ ট্রেন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সময়নিষ্ঠ।  এর গড় ডিলে বা দেরি হয় ১৮ সেকেন্ড এবং কোনো কারণে বেশি দেরি হলে আপনি তাদের থেকে অফিসের জন্য একটি ক্ষমাপ্রার্থী চিঠি পেয়ে যাবেন।

-- রোনাল্ড ম্যাক ডোনাল্ডকে জাপানে ডোনাল্ড ম্যাক ডোনাল্ড বলা হয় কারণ জাপানিজরা স্পষ্ট 'র ' উচ্চারণ করতে পারে না।


-- অনেকসময় জাপানের ট্রেনগুলিতে খুবই  ভিড় হয়ে যায় তাই জাপান শুধু রেলওয়ে যাত্রীদের ঠেলে ঢোকানোর জন্য আলাদা কর্মী নিযুক্ত করে ।

--আপনি যদি জাপানে ট্রেনের সামনে আত্মহত্যা করেন তবে আপনার পরিবারকে এই বিঘ্নের জন্য জরিমানা করা হবে.

--জাপানে 'ক্রাইং সুমো বলে এক প্রতিযোগিতা হয় যেখানে কুস্তিগিরদের মধ্যে যে আগে বাচ্চাকে কাঁদতে পারবে সে বিজয়ী হবে..

--জাপানে বাইরের লোক সবচেয়ে কম এখানে প্রায় ৯৮% জনসংখ্যা বংশগতভাবে জাপানিজ।

--- জাপানের টোকিও বসবাসের জন্য পৃথিবীর দ্বিতীয় সবচেয়ে ব্যায়বহুল শহর।