Friday, 29 May 2020

কিংবদন্তি ঠগ যিনি আইফেল টাওয়ার বিক্রি করেছিলেন --



ভিক্টর লাস্টিগ তার পেশাটি এক সাধারণ মানুষ হিসেবে শুরু করেছিলেন; যিনি কয়েকজন মানুষকে একটি মেশিন দেখিয়ে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলেন যে, এই মেশিনটি 100 ডলার বিল তৈরি করে।কেবলমাত্র একটি বাধা ছিল সেটি হলো, মেশিনটি ছয় ঘণ্টায় কেবলমাত্র একটি বিল তৈরি করতে পারে। তিনি এক একটি মেশিন কে 30,000 ডলারে বিক্রি করেছিলেন এবং তার সাথে আসল বিল ও দিচ্ছিলেন। এরপর যতক্ষণে তার খরিদ্দাররা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছিল, ততক্ষণে তিনি টাকাগুলি নিয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছিলেন। তিনি মোট কতগুলি মেশিন বিক্রি করেছিলেন এবং কতজন কে করেছিলেন তা আজ অব্দি রহস্য থেকে গেছে।

 1925 সাল নাগাদ যখন যুদ্ধ পরবর্তী কালীন ফ্রেঞ্চ অর্থনীতি যখন ভঙ্গুর হয়ে পড়ে তিনি তার সবচেয়ে দুঃসাহসিক পরিকল্পনাটি কাজে লাগিয়ে বিশাল পরিমাণ অর্থ আয়ত্তে আনতে সক্ষম হন। তিনি ফ্রেন্চ স্ক্রাপ মেটাল কোম্পানিগুলোকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সরকার আর বিখ্যাত বিভিন্ন গঠন গুলির রক্ষণাবেক্ষণ বা দায়িত্ব নিতে পারছে না -- এই বলে তিনি আইফেল টাওয়ারের বিভিন্ন অংশের হিসাব করে তাদের বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এই ধারণাটা সেই সময়ে সত্যিই অবিশ্বাস্য ছিল যখন সবেমাত্র টাওয়ার টিকে জনসাধারণের জন্য সাময়িকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। লস্টিগ তার পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের সাথে চুক্তি করেছিলেন যে 18 বছর বাদে কোম্পানি টাওয়ারটি খুলে বা ভেঙে ফেলতে পারবে। পরবর্তীকালে লাস্টিগের সাথে তার প্রেমিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং আলকাত্রাজ জেলে তার 20 বছরের কারাদণ্ড হয়। সাজা চলাকালীন 12 বছরের মাথায় নিউমোনিয়ায় তার মৃত্যু হয়েছিল।
আলকাট্রেজ 

Wednesday, 27 May 2020

চেঙ্গিস খানের আক্রোশ -- একটি কিংবদন্তি ঐতিহাসিক প্রতিশোধের কাহিনী --


খারেজমীন সাম্রাজ্যর কথা হয়তো আপনি শোনেননি এটা অসম্ভব নয় কারণ চেঙ্গিস খান এর প্রতিশোধ এতটাই ভয়ানক ছিল।

1205 সালে নাঈমানের যুবরাজ কুচলাগ মঙ্গোলিয়া থেকে পালিয়ে যায় যখন চেঙ্গিস খান এবং তার মঙ্গল সাম্রাজ্য তাদের এলাকা দখল করে। 1208 সালে চেঙ্গিস খান কুশলগকে পরাজিত করেন এবং কুচলাগ আরো পশ্চিমে চলে যায় এবং সেখানে ঝিলুগু সাম্রাজ্যে রাজ কন্যাকে বিবাহ করেন। 

পরবর্তীকালে নিজের শ্বশুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সৃষ্টি করে তিনি পশ্চিম লিয়াও সাম্রাজ্যের দখল নেন।  1216 সালে কুচলাগ বাসবালিক শহরে আক্রমণ করে, যেটা তখন মঙ্গল সাম্রাজ্যের আশ্রয় ছিল। তাই চেঙ্গিস খান তার অন্যতম পারদর্শী সেনাপতি জেবেকে সেখানে পাঠান এবং দুই বছরের মাথায় পুরো পশ্চিম অংশটি তার দখলে চলে আসে এবং মোঙ্গল সাম্রাজ্য খারেজমী সাম্রাজ্যের পর্যন্ত বিস্তার করে যায়। এই সাম্রাজ্যঃ খারেজমনের শাহ মোহাম্মদ ২ এর শাসনে ছিল। চেঙ্গিস খান তার ব্যবসায়ীদের সেখানে পাঠান খারেজমানদের সাথে ব্যবসা শুরু করার জন্য কিন্তু  অট্রার গভর্নর ইনালচুক এই ব্যবসায়ীদের গুপ্তচর বদনাম করে কারাগারে বন্দি করে রাখেন। বেশিরভাগ মানুষ তখনকার দিনে, পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত এই সাম্রাজ্য বিস্তারকারী ব্যক্তির সাথে সীমানা ভাগ করা ভালো বিষয় করতেন না,  তাই যখন চেঙ্গিস খান  500 মানুষের একটি দলকে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে তার এই নতুন প্রতিবেশীর কাছে পাঠালেন তখন খারেজমী শাহের মনে সন্দেহ হয়েছিল। যদিও বেশিরভাগ ইতিহাসবিদদের মতে, চেঙ্গিস খানের এই সাম্রাজ্য দখলের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না।

এরপরেও আক্রমণ না করে বা হুমকি না দিয়ে চেঙ্গিস খান সেখানে তার 3 জন প্রতিনিধি পাঠান; যার মধ্যে দুজন মঙ্গল ও একজন মুসলিম ছিল তারা এই 500 জন মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য কথাবার্তা শুরু করেন। কিন্তু তবুও শাহ বদলাননি; তিনি দুইজন মঙ্গলের মাথা মুড়িয়ে দেন এবং মুসলিম দূতের মাথা কেটে ফেলেন। এছাড়া তিনি বন্দী থাকা 500 জন ব্যবসায়ীকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করেন।

চেঙ্গিস খান অতিথি পরায়ণ নিয়ে এক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি তাদের এই অনৈতিক কাজে ক্রোধিত হয়ে পড়েন, তাই তারপর তিনি সিল্ক রোড থেকে তার শত্রুদের সম্পর্কে সকল তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তিনি চীন থেকে এলাকা দখল করা বিষয়ে পারদর্শী  ও অভিজ্ঞ একটি দল গঠন করে নিয়ে আসেন এবং খারেজমী সাম্রাজ্যঃ দখলের জন্য তার সেনাবাহিনীকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন। মঙ্গোলিয়ানদের কাছে এক লাখের উপর সৈন্য ছিল।
.
1219 সালের শীতের সময় তিনি যোশি এবং যেবেকে ফার্ঘানা প্রদেশ লুটপাটের জন্য জন্য 20,000 সেনাসমেত পাঠান।

খারেজমিয়ান সৈন্যরা ভেবেছিল যে এই আক্রমণকারী দলটি মূল শক্তি ছিল কিন্তু অন্য দিক থেকে চাগাতাই খান এবং ওগেদাই খান যুগারিয়ান গেট দিয়ে ঢুকে অত্রারের 20,000 জন এর শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে আটক করে ফেলে। এর পাঁচ মাস বাদে এক পলাতক শহরের দরজা খুলে দিয়ে মোঙ্গলদের শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে; তারপর এখানে মানুষদের বন্দী করা থেকে শুরু করে গণহত্যা শুরু হয়ে যায় এবং শহরটি মাটিতে মিশে যায়। ইনালচুকের চোখে এবং কান দিয়ে গলিত রুপো ঢেলে হত্যা করা হয়।

এরপর চেঙ্গিস খান এবং তার সৈন্যরা দুর্গম কিজিলকুম মরুভূমি অতিক্রম করে এবং বুখারা দখল করে নেয়। এখানকার রক্ষীরা যুদ্ধ ও গণহত্যা শুরু হওয়ার আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। চেঙ্গিস খান খারেজমী সাম্রাজ্যের রাজধানী সামারকান্দ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। 1220 সালে এই শহরের 40,000 জনের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীকে ঘিরে ফেলেন। এরপর তৃতীয় দিনে যখন সেই বাহিনী আক্রমণ শুরু করে, তখন চেঙ্গিস খান একটি ছলনা পূর্বক পলায়ন করেন এবং এই বাহিনীকে প্রলুব্ধ করে বাইরে বের করে আনেন ও  প্রায় অর্ধেক সংখ্যক বাহিনীকে হত্যা করা হয়। তাদের দুটি সাহায্যের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পঞ্চম দিনে বেঁচে থাকা কিছু হাতেগোনা সৈনিক আত্মসমর্পণ করে; এরপর এক লাখ জনসংখ্যা বিশিষ্ট শহরে বিপুল নরসংহার  শুরু হয়ে যায়। শাহ এবং তার পুত্র উত্তর-পশ্চিম দিকে পালিয়ে যায় এবং চেঙ্গিস খান সেনাপতি সবেতেই এবং জেবেকে  20,000 সৈন সহকারে তার উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেন।  এদিকে সামারকান্দ ধ্বংস করার পর উর্গেস কে ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং খোরাসান, রেজিন, বালক, মারভ নিশাপুরে - তারা পরপর সাফল্য পেতে থাকে; এদিকে হেরাত এবং অন্যান্য শহর যারা শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। নিজেদের কার্যসিদ্ধির জন্য এবং এইসব শাসকদের শাসনের বিরুদ্ধে মঙ্গোলরা একটি দক্ষ নিষ্ঠুরতার পরিকল্পনা ব্যবহার করেছিল।

এদিকে মহম্মদ এর পুত্র জালালউদ্দিন মিংবুমু প্রায় 60,000 জন তুর্কি এবং আফগানি যোদ্ধাদের দলকে নিযুক্ত করেন। ফলে চেঙ্গিস খান সেনাপতি শিকিখতুক কে 30,000 জন সৈনিকের নেতৃত্বে জালালুদ্দিন এর উদ্দেশ্যে কাবুলের উত্তরে পাঠান।
এটি নিশ্চিত যুদ্ধপরিস্থিতিতে একটি সরু খাতের মাঝে দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি হয়। যে স্থানটি মঙ্গলিয়ান সেনাবাহিনীর পক্ষে অনুপযুক্ত ছিল।  ফলে মঙ্গল সেনাবাহিনী একটি লজ্জাজনক হারের সম্মুখীন হয় এবং যখন তারা পিছু হটতে থাকে। তখন জালালউদ্দিন তার সৈন্যদের পুনরায় আক্রমণে পাঠায়, ফলে এই বাকি সেনাবাহিনীর অর্ধেক জন হারিয়ে যায় এবং বাকি অর্ধেক পালাতে সক্ষম হয়। এই পরাজয় মঙ্গল বাহিনীর অপরাজেয় তকমাটি ভেঙে দেয়।

এরপর খারেজমী সাম্রাজ্যের জন্য মধ্য এশিয়ায় বিদ্রোহের সূচনা হয় যদিও জালালউদ্দিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে পরবর্তী কয়েক মাসে একটি অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং জালাল উদ্দিন ভারতবর্ষে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পালিয়ে আসে; কিন্তু জালালউদ্দিনেই বাহিনী ইন্ডাস নদী পেরোনোর  আগে চেঙ্গিস খান তাদের ধরে ফেলে ফেলতে সক্ষম হয় এবং মঙ্গল বাহিনী তাদের সেনাবাহিনীকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়। 
এরপর 20,000 জনের মোঙ্গলবাহিনী যুবরাজকে ধরে আনার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় কিন্তু তাকে আর  খুঁজে পাওয়া যায়নি। খারেজমিনের বেশিরভাগ অংশ দখলে চলে যায় এবং শাহ তার বাকি জীবন ক্যাস্পিয়ান সমুদ্রের একটি দ্বীপে নির্বাসনে কাটাতে কাটাতে দেহত্যাগ করেন। এদিকে মোঙ্গলরা মধ্য এশিয়ার জনসংখ্যা দুই মিলিয়ন থেকে 2 লাখে কমিয়ে আনে এবং তারা অন্যান্য সম্রাজ্য দখল করার জন্য মনোনিবেশ করে।

এদিকে ইন্ডাস নদীর তীরে যুদ্ধের পরে জালালউদ্দিন তিন মাস পাঞ্জাবে কাটান, তার শক্তি সঞ্চয় এবং হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন এলাকা দখল করার উদ্দেশ্যে তিনি মামেলুক এর সুলতান ইলতুৎমিশের সাথে সন্ধি করার চেষ্টা করেন কিন্তু  ইলতুৎমিস চেঙ্গিস খানের বিরুদ্ধে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বরঞ্চ 1224 সালে সুলতান জালালউদ্দিনকে আক্রমণ করে এবং তাকে লাহোর ত্যাগ করতে বাধ্য করে।  যেহেতু জালাল উদ্দিনের পিতা অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছিল তাই জালালুদ্দিন খারেজমিন সাম্রাজ্যের মুকুট সহজেই পুনরাধিকার করে নেন।  তিনি আজারবাইজান দখল করেন এবং তার রাজধানী তব্রিজ এ নিয়ে যান।  এরপর তিনি জর্জিয়া দখল করেন এবং বিলিসি নামে একটি বড় শহরের দখল করে সেখানকার খ্রিস্টান এবং মুসলিম উভয় বাসিন্দার গণহত্যা করেন।

এরপর মঙ্গল 1227 সালে একটি ছোট বাহিনী ইরানে পাঠায় কিন্তু জালালউদ্দিন এদেরকে পরাজিত করে। কায়াওয়াবাদ, আয়ুবিদের সুলতান এবং আর্মেনিয়ার রাজা জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে একত্রিত হয় এবং 1228 সালে তাকে ইরাভানে পরাজিত করে।  এরপর তার সাম্রাজ্যঃ জুড়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ সূত্রপাত হয়।

অবশেষে চেঙ্গিস খানের পুত্র অগেদেই খান তার চর্মাকান নামক সেনাপতিকে ইরান পুনর্দখলের জন্য পাঠান এবং সেখানে সেন্ট্রাল ইরানে 1231 সালে জালালউদ্দিন পরাজিত হয়ে তুর্কিতে পালিয়ে যায়। যেখানে তাকে হত্যা করা হয় এবং খারেজমী সাম্রাজ্যের অবশেষে সমাপ্তি ঘটে এরপর জর্জিয়া ও অন্যান্য দেশগুলি মঙ্গলের ছত্রছায়ায় চলে আসে। 

Sunday, 17 May 2020

কালাহারি মরুভূমির হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা --

বর্তমানে কালাহারি মরুভূমি কে পৃথিবীর শুষ্কতম স্থানের মধ্যে অন্যতম হিসাবে দেখা হয়। কালাহারি শব্দটি উৎপত্তি 'tswana' শব্দ থেকে যার অর্থ - ভীষণ পিপাসা; তাই জন্য এই স্থানটি কোন প্রাচীন শহরের অবস্থান হিসেবে কল্পনা করা কষ্টকর। কিন্তু এখানকার প্রাচীন কিংবদন্তি বা আদিবাসীদের লোককথায় পাওয়া যায় মরুভূমির সমুদ্রের মাঝে কোথাও প্রাচীন শহর অবস্থিত আছে যা এখানকার কেউ তৈরি করেনি। 

ঘটনার সূত্রপাত 1885 সালে যখন আমেরিকান উইলিয়াম লিওনার্ড যিনি একজন বিনোদনকারী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে একজন অভিযাত্রী হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন, 'গিলার্মো ফেরিনি' - ছদ্মনামে কালাহারিতে এসেছিলেন এবং তার দলে তার সন্তান লুলু ও যোগদান করেছিল। একটি শুষ্ক অঞ্চলে যাতায়াতকালে তাদের সামনে  প্রাচীন ভগ্নাবশেষ এসে পড়ে।  বিশাল বিশাল পাথরের তৈরি এবং সিমেন্ট দিয়ে তৈরি পাথরের দেওয়াল এবং সেমিসার্কুলার স্থাপত্য দেখতে পান। তিনি এখানে কোন চিহ্ন বা লেখার খোঁজ করেছিলেন কিন্তু এ জাতীয় কিছু খুঁজে পাননি। তিনি দাবি করেছিলেন যে এটা কোন প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ হতে পারে যা কালাহারি মরুভূমিতে অবস্থিত ছিল।
ফেরিনী তার আবিষ্কার গুলি বা তথ্যগুলি বার্লিনের জিওগ্রাফিকাল সোসাইটির কাছে পেশ করেন এবং 1886 সালে আবার গ্রেট বৃটেনের রয়েল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটির কাছেও নিয়ে যান. তিনি তার এই আবিষ্কার নিয়ে একটি বইও প্রকাশ করেছিলেন। 

বুশম্যান 

ফেনীর এই দাবিগুলো অভিযাত্রীদের মনে এক অসাধারণ আকর্ষণের সৃষ্টি করেছিল। কালাহারি মরুভূমিতে পরবর্তী 130 বছর ধরে অন্তত 30 টি এক্সপিডিশন এই প্রাচীন শহরের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। একটি বড় জটিল সমস্যা ছিল যে ফেরেনি কিভাবে সেই স্থানে পৌঁছেছিল  অর্থাৎ তার যাত্রাপথ বা দিক নির্দেশ এর বর্ণনা বিস্তারিত ভাবে পাওয়া যায়নি। এছাড়া তিনি বলেছিলেন যে, এই স্থানের অর্ধেক অংশ মরুভূমির নিচে ডুবে আছে তাই এই স্থানটি খুঁজে বের করা খুবই কষ্টকর। বিশাল কালাহারি মরুভূমিতে এই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করা অনেকটা খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

1964 সালে এ.জে.ক্লিমেন্ট নামক একজন অধ্যাপক ও অভিযাত্রী দাবি করেছিলেন যে তিনি হয়তো ফেরিনীর আসল যাত্রা পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মানুষের বসতির কোন হদিস পাননি, তবে তিনি ডলেরাইট পাথর দিয়ে তৈরি কিছু অদ্ভুত রকমের গঠন দেখতে পেয়েছিলেন। 
এছাড়া ব্যাসল্ট এবং 'gabbro' এর মাঝে দানাদার আকৃতি বস্তুর উপস্থিতি লক্ষ্য করেছিলেন।
ডলোরাইট এর পরিখায় প্রায়ই দেখা যায় যেখানে উত্তপ্ত বা গলে যাওয়া পাথর পুরনো পাথরকে ভেদ করে দেওয়ালের মত আকৃতির জিওলজিক্যাল ফর্মেশন সৃষ্টি করে। একে 'ডাইক' বলে এই 'ডাইক' যে পাথর গুলি দিয়ে তৈরি হয় তা সাধারনত আশেপাশের পাথরগুলি থেকে বেশ শক্তপোক্ত হয় তাই অন্যান্য পাথরগুলি ক্ষয় হয়ে যাওয়ার পর কেবলমাত্র 'ডাইক'  অবস্থান করে এবং কয়েকটি ডলোরাইট পাথরের ডাইস দেওয়ালের মত অংশের সৃষ্টি করে - যা দূর থেকে দেখে কোন প্রাচীন শহরের দেওয়াল বলে মনে হতে পারে।

তাই ক্লিমেন্ট বলেছিলেন, হতে পারে পারিনি এই জাতীয় কিছু 'রক ফর্মেশন' এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভুল করে মানুষের তৈরি স্থাপত্য ভেবেছিলেন এবং তিনি মনে করতেন বেশিরভাগ কালাহারি অঞ্চল গত অন্তত 15000 বছর ধরে কোন সভ্যতার উপস্থিতির পক্ষে খুবই শুষ্কতম স্থান। 

কাছাকাছি 2013 এবং 2016 সালে দুইটি এক্সপিডিশন লঞ্চ করা হয়েছিল 'marcahuasi project' নামক একটি রিসার্চ প্রজেক্ট এর জন্য একটি অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল যাতে কোন কৃত্রিম স্থাপত্য বা কোন ব্যতিক্রমী গঠন খোঁজার চেষ্টা হয়েছিল। এতে গুগল ম্যাপ এর সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। এই অনুসন্ধানটিতে খুবই উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছিল; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শহরের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। 
এরপর 2016 সালে একটি ট্রাভেল চ্যানেলের সহায়তায় একটি এক্সপিডিশন চালানো হয়। এই এক্সপিডিশনে এরিয়াল সার্ভে এবং রাডার এর সাহায্য নেওয়া হয়। সেখানে পাথরের প্রাচীন এবং অস্বভাবিক গঠন খুঁজে পাওয়া গেছে; অনেকটা ফেরিনির বর্ণনার মত। কিন্তু সেগুলি মনুষ্যনির্মিত না প্রাকৃতিক তা এখনো অস্পষ্ট রয়ে গিয়েছে।
চাকো ক্যানিয়ন ডেসার্ট সিভিলাইজেশন 

কালাহারিমরুভূমির ভেতরে কোন শহরের অবস্থান করার পক্ষে সবচেয়ে বড় বিরোধিতা হলো এখানকার অসম্ভব শুষ্ক আবহাওয়া। সূর্যের এই অসম্ভব পুড়িয়ে দেওয়া তেজে কোন প্রাচীন সভ্যতার অবস্থান খুবই কঠিন। কালাহারি মরুভূমি আধা শুষ্ক এবং আধা আদ্র কালাহারি বেসিনের একটি অংশ যা বতসোয়ানার বেশিরভাগ অংশ, নামিবিয়ার কিছু অংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা কভার করে; টেকনিক্যালি একে 'সাভানা' বলা যেতে পারে।

এর উত্তর অংশ তুলনামূলকভাবে বৃষ্টি হয় যার জন্য এখানে কিছু প্রকার গাছপালা এবং ঘাস এবং কিছু  প্রকার পশু দেখতে পাওয়া যায়। সাভানার দক্ষিণ প্রান্ত আরো শুষ্ক এবং এখানে বেশিরভাগ বালিয়াড়ি অঞ্চল দেখতে পাওয়া যায়। যেহেতু এটি খুবই শুষ্ক তাই কালাহারি মরুভূমিতে কোন মনুষ্যবসতি দেখতে পাওয়া যায় না। কেবলমাত্র 'san people' বা 'বুশম্যান' নামক এক জাতির মানুষ এর কাছাকাছি বসবাস করে। এরা বহু প্রাচীন কাল ধরে এই স্থানে বসবাস করে। বলা হয় এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম আদিবাসীদের মধ্যে অন্যতম। আর্কিওলজিক্যাল রেকর্ড অনুযায়ী অনুমান করা যায় যে, কালাহারি মরুভূমিতে বসবাসরত অধিবাসীরা বেশিরভাগই ভ্রাম্যমান শিকারি বা 'hunter- gatherers' হিসাবে জীবনযাপন করেছে। এদের বড়জোর ছোট ছোট কিছু গ্রাম দেখা গেছে কিন্তু কোন বড় বসতি বা শহর করে থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এত শুষ্ক থাকা সত্বেও এখানে জলের দুটি বড় উৎস আছে এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ বিশাল জলাধার আছে এবং এছাড়াও 'অকাভাঙ্গ' নদী এর পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে - যা মূলত এখানকার জলের চাহিদা যোগান দেয়। তাই এদের থেকে দূরে  অবস্থিত কালাহারি মরুভূমির ভিতরে কোন শহর তৈরি করলে তাদের পক্ষে জলের ব্যবস্থা করা খুবই দুস্কর বিষয়। 

তবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনাও দেখা গেছে। যেখানে কালাহারি মরুভূমি থেকেও অনেক শুষ্ক জায়গায় মানুষ বসতি স্থাপন করেছিল। এরকম একটি উদাহরণ হচ্ছে - আমেরিকান 'চাকো ক্যানিয়নের' 'ডেজার্ট সিভিলাইজেশন' বা 'প্রোটো সিভিলাইজেশন' এই চাকো ক্যানিয়নটি হচ্ছে মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমের সান যুয়ান বেসিনে অবস্থিত একটি ক্যানিয়ন। এটি খুবই শুষ্ক অঞ্চল যেখানে জলের প্রধান উৎস 'চাকো' নদী যার সৃষ্টি হয় বর্ষার সময় জমে থাকা জল নেমে আসলে। প্রচুর শুষ্ক অবস্থা হওয়া সত্বেও বহু শতাব্দী ধরে এখানে মানুষেরা বসবাস করে গিয়েছে। প্রায় 800 খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাচীন 'পুব্লন' মানুষেরা এই ক্যানিয়নে এসে বসবাস করতে শুরু করে এবং তার কয়েক শতাব্দী মধ্যেই তারা বাঁধের মাধ্যমে একটি জটিল সেচ প্রণালী গড়ে তোলে এবং এইভাবে জলের ব্যবহার করতে থাকে। পরবর্তীকালে তারা ধীরে ধীরে ছোট থেকে বিভিন্ন বড় বড় গ্রাম গড়ে তোলে।  বড় গ্রামগুলিতে বা এগুলির কেন্দ্রে অনেক বড় বড় বাড়িও খুঁজে পাওয়া যায় যেগুলি তে অনেকগুলি কক্ষ, ধর্মীয় স্থান এবং স্তর ছিল।

এই বড় বড় বাড়ি গুলির মধ্যে অন্যতম ছিল 'পুয়েব্লো বনিতো' - যেখানে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ব্যবসা করে আনা জিনিসপত্র মজুদ রাখা হতো। এই চাকোয়ানরা সত্যিকারের বড় কোন শহর গড়ে তোলেনি ঠিকই; কিন্তু তাদের একটি জটিল সমাজ ব্যবস্থা ছিল এবং এদের কেন্দ্রবর্তী অঞ্চলগুলির আকার বড় বড় গ্রামের সাথে তুলনা করা যায়। তাদের কাছে বড় বড় স্থাপত্য অথবা বিল্ডিং তৈরি করার জন্য যথেষ্ট শ্রমিক এবং পুঁজিও ছিল। এখানে চাষবাস করার পক্ষে অনুপোযোগী স্থান হওয়া সত্বেও তারা টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল; যদিও সেটা চিরস্থায়ী হয়নি --1130 সালের শুরুর দিকে ক্যানিয়ন এক খরা দেখা দেয় এবং 1200 সাল নাগাদ বেশিরভাগ মানুষ স্থানটি ত্যাগ করে চলে যাওয়া শুরু করে। 

যদি চাকো ক্যানিয়নের মত স্থানে প্রাচীনকালে এরকম একটি উন্নত মানের বসতির অবস্থান সম্ভব হয় তবে কি কালাহারি মরুভূমিতেও এরকমই কিছু ছিল?
কিন্তু এরকম ঘটনা খুবই বিরল, পৃথিবীর অন্যান্য শুষ্কতম স্থান গুলি; যেমন- চিলির আটাকামা মরুভূমি বা মধ্য অস্ট্রেলিয়ায় যে সকল আদিবাসীরা বাস করে, তাদেরকে সাধারণত কোন বড় বসতি স্থাপন করতে দেখা যায়নি।
প্রাচীন সুমের এবং ইজিপ্টের সভ্যতাও মরুভূমি স্থানে গড়ে উঠেছিল কিন্তু তাদের কাছে জলের অভাব ছিল না কারণ তারা মরুভূমির কেন্দ্রে নয়, বরঞ্চ নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।
যদিও কালাহারি মরুভূমি আজকের দিনে শুষ্কতম অঞ্চল কিন্তু এটা সব সময় এতটা শুষ্ক ছিল না প্রায় 10000 বছর আগে কালাহারি বেসিন এ অনেক বড় বড় জলাশয় অবস্থান করতো এবং এখানে গাছপালা থাকার দরুন আরো অনেক সবুজ ছিল।

তাই এটা বলা যেতে পারে যে 10,000 বছর আগে যখন এই মরুভুমি শুষ্ক ছিলনা, হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন শহরটি হয়তো তখন এখানে অবস্থান করতো; কিন্তু এই সময়কালীন দক্ষিণ আফ্রিকায় কোন বড় সভ্যতার বসতি গড়ার করার কোন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তাই এটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে এটি সাব সাহারান আফ্রিকার প্রথম বড় মনুষ্য বসতি হতে পারে।

ইতিহাসবিদ গুস্তাভ প্রেলুদে এখানকার লোককাহিনীর বর্ণনা অনুযায়ী পেরিনির বর্ণিত স্থান থেকেও উত্তরে আরো কিছু মূল্যবান পাথর খুঁজে পান এবং তিনি দাবি করেন এখানে কিছু ধ্বংসাবশেষ ছিল। কিছু কিছু মানুষ দাবি করেছেন যে, মরুভূমির মাঝে কৃত্রিম খাত, এমনকি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেয়েছেন।

এই নিদর্শন গুলিকে নিছক ব্যতিক্রমী একপ্রকার রক ফর্মেশন ভেবে নিয়ে কি মানুষ আপাতত তাদের খোঁজ বা অভিযান বন্ধ করে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে ? যদি এখানে সত্যিই কোনো প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন ভবিষ্যতে প্রমান হয়ে যায় তবে নিঃসন্দেহে সেটা স্মরণীয় একটি বিষয় হবে।  
আপনার কি মনে হয় ?

Wednesday, 13 May 2020

আল জাজিরা আল হামরা পরিত্যক্ত ও রহস্যময় ভুতুড়ে শহর ---


'জাজিরাত আল হামরা' যার অর্থ হচ্ছে -- লাল রঙের দ্বীপ। এই দ্বীপটি একটি ভৌতিক স্থান হিসেবে কুখ্যাত। চৌদ্দশ শতকের দিকে এই গ্রামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় এখানে 300 টি বাড়ি এবং 13 টি মসজিদ ছিল। এখানকার মানুষেরা মৎস্যচাষ এবং মুক্ত সংগ্রহ করে জীবিকা পালন করত। কিন্তু হঠাৎ করে 1968 সালে এটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তখন থেকে ইউনাইটেড আরব এমিরেটস থেকে রাস-আল-খাইমার এই ছোট স্থানটি আলাদা হয়ে গিয়েছে এবং একে ঘিরে রেখেছে রহস্যময় বিভিন্ন কিংবদন্তি।

এই জেলেদের শহরটি ইউনাইটেড আরব এমিরেটসের উত্তর পূর্ব দিকে অবস্থিত। 1960 সালে তৈল খনি নিয়ে আরবে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সৃষ্টি হওয়ার আগেও এখানে প্রাচীনকাল থেকে অনেক অবস্থাসম্পন্ন এবং বিভিন্ন রকমের বসতি সমৃদ্ধ ছিল। অনেক বছর ধরেই এই সমুদ্রতীরবর্তী গ্রামটি পার্শিয়ান অভিবাসী, পর্তুগিজ ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ আধিকারিকদের আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এমনকি যখন 1831 সালে গ্রামটি নবনির্মিত করা হয় তখন ব্রিটিশ রেকর্ড অনুযায়ী জানতে পারা যায়, এখানে 4100 জন বাসিন্দা ছিল যাদের মধ্যে বেশিরভাগই লাভজনক মুক্ত ব্যবসায়ী ছিলেন। 


এরপর 1968 সালে এখানকার বাসিন্দারা দলে দলে স্থানটি ছেড়ে দিতে শুরু করলেন এবং গ্রামটি পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। অনেক প্রাক্তন বাসিন্দাদের কাছে এই গ্রামের জমির মালিকানা এখনো আছে; কিন্তু খুব কম লোকই এখানে থাকে। 1960 সালের পর থেকে এই গ্রামটি ভৌতিক গ্রাম হিসেবে কুখ্যাত হতে থাকে। অনেক u.a.e. বাসিন্দারা মনে করেন, এই গ্রামটি জিনদের দ্বারা পরিচালিত হয় এই গ্রাম সম্পর্কে অনেক হিংস্র এবং অসৎ ভৌতিক ছড়িয়ে আছে।

স্থানীয় ভৌতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা ফয়সাল হাশমি জানিয়েছেন, তিনি একবার ঠিক করেছিলেন তার কিছু বন্ধুদের সাথে গ্রামটিতে একটি রাত কাটানোর। গ্রামটি ধীরে ধীরে তাদের মনে এক ধরনের ভয়ের সঞ্চার করেছিল এবং একটা সময় তারা আশেপাশে এখানকার বসবাসরত অশরীরীদের টাটকা হাতের ছাপ গুলি দেখতে  শুরু করে ঠিক যেন অশরীরিরা তাদের এলাকায় না প্রবেশ করার জন্য তাদেরকে সতর্কবার্তা বা সাবধান করে দিচ্ছিল।

হাসমির এই ঘটনাটি আলাদা রকমের ছিল না এর আগেও বহু অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়, ভ্রমণকারী ও নৈশ ভ্রমণকারীরা যারা এখানে আগে এসেছিল  তাদের সাথে এরকম বহু রহস্যময় ঘটনা ঘটেছিলো। যদিও কিছু কিছু মানুষ এই গ্রামে কোন জিন নেই বলে  ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু বেশিরভাগ স্থানীয়রা কখনো কখনো অর্থাৎ অন্তত একবার জিনকে দেখেছেন অথবা তাদের সাথে কোন ঘটনা ঘটেছে।

Sunday, 10 May 2020

হিটলার কি আসলে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে ছিলেন?

গত 15 বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে এই গল্পটা ছড়িয়ে পড়েছে যে হিটলার আসলে বার্লিন থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং তার বাকি জীবন দক্ষিণ আমেরিকায় ফাদার ক্রেসপি নামে অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু ফাদার ক্রেস্পি যে হিটলার ছিলেন, তার স্বপক্ষে কি কি প্রমাণ পাওয়া যায়?

ফাদার ক্রেসপি 1982 সালে 90 বছর বয়সে মারা যান। প্রায় 2,000 এর বেশি মানুষ তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন; ঠিক যেন একজন রাজার মতো।
তার কবরটি সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল যেটা এখনো প্রতি সপ্তাহে পরিষ্কার করা হয় এবং রোজ তাতে ফুল দিয়ে সাজানো হয়, যার খরচ দেয় অজ্ঞাতনামা বা নাম গোপন রাখা বিভিন্ন ভক্তরা।
তার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে বেশ কিছু কৌতূহলপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি তার বাসস্থানে বহু মিলিয়ন ডলার এর দামি বেশ কিছু আর্ট ওয়ার্ক ফেলে গিয়েছিলেন।
স্থানীয় জার্মান এবং অন্যান্যরা পরবর্তীকালে এর মধ্যে বেশির ভাগ আর্টওয়ার্ককে এডলফ হিটলারের ব্যক্তিগত কালেকশনের অংশ  হিসাবে সনাক্ত করেন।
হিটলার আর্টওয়ার্ক সংগ্রাহক হিসাবেও বিখ্যাত ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে তার মৃত্যুর পর তার বেশিরভাগ ব্যক্তিগত সংগ্রহ আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, 16 মে 1982 সালে ফাদারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঠিক পরেই দুটি কার্গো জেট এসে ফাদার ক্রিসপির আর্ট কালেকশন গুলি ভরে নিয়ে উড়ে যায় এবং আর কখনো এগুলি দেখতে পাওয়া যায় না। কুইন্স শহরের পুলিশ কর্তা রিপোর্ট করেছিলেন যে, একটি ইউরোপিয়ান দল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঠিক একদিন আগে এই ছোট শহরে প্রবেশ করেছিল। এইসব যাত্রার বেশিরভাগ উপস্থিত মানুষ জার্মান ছিলেন এবং সশস্ত্র রক্ষী যুক্ত ছিল।

এটাকি সম্ভব যে, একজন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকরতম মানুষ বিচারব্যবস্থা থেকে পালিয়ে গিয়ে 40 বছর ধরে একজন ঈশ্বরের দুত সেজেছিলেন?

তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শেষ বছরে হিটলারের সমস্ত মেডিকেল রেকর্ড ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল এবং তাকে যে সকল ডাক্তাররা দেখেছিলেন তারা সকলেই রহস্যময়ভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। ব্যতিক্রমী ছিল কেবলমাত্র একজন কম বয়সী ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট যাকে দুবার হিটলারের দাঁত পরিষ্কারের সময় তার ডেন্টিস্টকে এসিস্ট বা সাহায্য করার জন্য ডাকা হয়েছিল।

এই মহিলাটিকে রাশিয়ান আর্মি পরবর্তীকালে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং তারা তাকে দিয়ে হিটলারের দাঁতের চিত্র অংকন করার চেষ্টা করেছিল। যাতে তারা বার্লিনের বাংকারে যে অবশিষ্ট দেহাংশগুলি পেয়েছিল তার সাথে মিলিয়ে দেখতে পারে। কারণ তখনো পর্যন্ত হিটলারের কোন বিশ্বস্ত ডেন্টাল রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
দিনের পর দিন টর্চারের পরও তার স্মৃতিতে হিটলারের  দাঁতের আসল আকৃতি স্পষ্টরূপে ছিলনা কিন্তু রাশিয়ানরা স্থির করেছিলেন যে সেটুকুই যথেষ্ট ছিল।
স্ট্যালিন কখনোই হিটলারের মৃত্যু বিশ্বাস করেননি; কিন্তু হিটলার রাশিয়ান আর্মির হাত থেকে পালিয়ে গিয়েছে এইটি তিনি পৃথিবী কে ভাবতে দিতে চাননি।

1981 সালে ওয়েন্ডেল স্টিফেন নামক একজন অবসরপ্রাপ্ত ইউএস আর্মি কর্নেল ইকুয়েডরে একটি ট্রিপে গিয়েছিলেন তার ট্রিপ চলাকালীন তিনি 'কুয়েনকা' নামক একটি ছোট শহরে একজন সন্ন্যাসীর সাথে দেখা করেন। এই সন্ন্যাসীর নাম ছিল ফাদার ক্রেসপি এবং কর্নেল স্টিফেন্স বিশ্বাস করতেন তিনি আসলে এডলফ হিটলার ছিলেন। তার সন্ন্যাসী সম্পর্কে দাবি গুলি কেউ শোনেনি। তিনি হিটলারের হাজার হাজার ফটো পরীক্ষা করেছিলেন এবং আরো জোরালোভাবে তার বিশ্বাস হয়েছিল, যে তিনি হিটলারকে খুঁজে পেয়েছেন। তিনি ইকুয়েডরের পাহাড়ের উপরে ফাদার ক্রেসপির নির্জন বাড়িতে থাকা অমূল্য আর্টওয়ার্ক গুলি সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছিলেন কিন্তু কেউ তার দাবি গুলো তখন শোনেনি।

ফাদার ক্রেসপির অতীত জীবন রহস্যময় ছিল ক্রেসপি দাবি করেছিলেন, তিনি আসলে উত্তর ইতালির ইটালিয়ান ও অস্ট্রিয়ান পরিবার থেকে এসেছেন। 1943 সালের শেষে তিনি ভ্যাটিকানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সেরিমনিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং একজন ব্রতচারী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাকে গুরু হিসাবে সম্মান দেওয়া হয়েছিল এবং এই সকল কিছু ভ্যাটিকানের বন্ধ দেওয়ালের ভিতর ঘটেছিল। যা এই সময়ে শোনা যায়নি এবং পরবর্তীকালেও কখনো এরকম কিছু হয়নি। তিনি এই সময়কালীন কখনো ভাটিকান শহরের বাইরে পা রাখেননি। এই শহরটি বিভিন্ন দেশ থেকে ডিপ্লোম্যাটিক ইমিউনিটি পেয়েছিল। ক্রেসপিকে ভাটিকানের সংগ্রহশালার তত্ত্বাবধায়কের পদে রাখা হয়েছিল। এই পথটি একজন নতুন ব্রতচারী পদমর্যাদার কারোর পক্ষে অনেক উঁচু ছিল।
তার এই পদের জন্য তাকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিভিন্ন কালেকশন কে তালিকাভুক্তকরণ এর কাজ করতে হতো।

এছাড়া বহু অমূল্য কালেকশন যার মধ্যে অনেকগুলি নাৎসিদের দ্বারা লুট করা ছিল এবং যুদ্ধের পর সেগুলি কোনভাবে ভ্যাটিকানের হাতে এসে পড়ে।
1956 সালে ক্রেসপিকে ইকুয়েডরের কুইন্স শহরে একজন ধর্মযাজক হিসেবে পাঠানো হয়। নাজি হান্টারদের কাছে এই শহরটি জার্মানি থেকে পলাতক মার্টিন বোরম্যান এবং অন্যান্য উচ্চ পদাধিকারী নাৎসিদের গুপ্তআশ্রয়স্থল হিসেবে বিখ্যাত ছিল।
সেখানে তিনি একান্ত জীবন যাপন শুরু করেন এবং রিপোর্ট অনুযায়ী, ধর্ম সভায় সাহায্য করার জন্য তিনি সকল সদস্যদের অর্থ প্রদান করতেন; এমনকি তিনি গ্রামবাসীদের তার লক্ষ্য পূরণ করার উদ্দেশ্যে অর্থ দিতেন। গ্রামবাসীদের মধ্যে জার্মান মানুষরা প্রায়ই তার সাথে দেখা করতে আসত।

ক্রিসপি বলেছিলেন, তার এই আর্টিফ্যাক্ট গুলি ব্যাবিলনিয়া থেকে প্রাপ্ত।
প্রসঙ্গত: হিটলার তার যে শহরটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন 'জার্মানিয়া' তার সাথে তিনি প্রায়শই 'ব্যাবিলনিয়ার' তুলনা করতেন। 
হিটলারের মতো ক্রেসপিও বিভিন্ন আর্টিফ্যাক্ট সংগ্রহ করতেন।
ক্রেসপির কথা বলার ভঙ্গিমায় হিটলারের সাথে মিল পাওয়া গিয়েছিল এবং তার 'R' এর উচ্চারণটি অন্যরকম ছিল ঠিক হিটলার এর মতো !!